সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

গাজার ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান নেতানিয়াহুর, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার নয়

গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, হামাস ‘প্রকৃত অর্থে নিরস্ত্র’ না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না।

মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল ১৫ দফার নথিটি প্রত্যাখ্যান করছে।’ তিনি স্পষ্ট করেন, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আগে হামাসকে তার সব অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে।

গত জুলাইয়ের শেষ দিকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন গাজা যুদ্ধবিরতি কাঠামোয় অগ্রগতির কথা জানিয়েছিলেন। ওই পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে হামাস ও গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র সমর্পণের বিনিময়ে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং নতুন একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে গাজার শাসনভার হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে।

কী আছে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনায়?

৩০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ গাজার জন্য ১৫ দফা একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করে। এতে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নিরস্ত্রীকরণ, নিরাপত্তা, প্রশাসনিক পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের জন্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি কাঠামো তুলে ধরা হয়।

পরিকল্পনার মূল শর্ত হলো—হামাসকে নিরস্ত্র হতে হবে। এর বিনিময়ে গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির কাছে প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে। ওই প্রশাসনকে একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী সহযোগিতা করবে।

ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর নেতৃত্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে গাজা শান্তি পরিকল্পনা তদারকির দায়িত্বও এই সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিকল্পনাটি কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণ যত এগোবে, ইসরায়েলি বাহিনীও তত ধাপে গাজা থেকে সরে যাবে।

তবে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসরায়েল তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে কি না, তার ওপর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাদের অংশগ্রহণ নির্ভর করবে।

অন্যদিকে, ‘বোর্ড অব পিস’ সম্প্রতি জানিয়েছে, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ সম্পূর্ণ হওয়ার পরই গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে।

নেতানিয়াহুর অবস্থান কী?

পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাস ‘প্রকৃত অর্থে নিরস্ত্র’ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনারা গাজা থেকে সরে যাবে না।

তিনি বলেন, ইসরায়েল ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে। পরিকল্পনার কিছু বিষয় ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও কিছু বিষয়ে তারা আপত্তি জানিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নেতানিয়াহুর ভাষায়, ‘আমরা প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণের কথা বলছি, কাগজে-কলমে বা ভুয়া নিরস্ত্রীকরণের কথা নয়।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে ডানপন্থী রাজনৈতিক শিবিরের চাপের মুখে নেতানিয়াহু গাজা পরিকল্পনা নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়া কী?

গাজায় থাকা অনেক ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের পক্ষ থেকে পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা আগে থেকেই করেছিলেন বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ বলেন, পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যানের ফলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তার মতে, পরিকল্পনাটি যুদ্ধ বন্ধের জন্য একটি কাঠামো ও ধাপ নির্ধারণ করেছিল।

পরিকল্পনায় গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের মতো বিষয় ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের প্রত্যাখ্যানের ফলে এসব পদক্ষেপ কীভাবে এবং কোন ক্রমে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক আলোচক দলের উপদেষ্টা জাভিয়ের আবু ঈদ মনে করেন, পরিকল্পনাটিতে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের তুলনায় ইসরায়েলের স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যান পেরির মতে, গাজা পরিকল্পনার বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর অবস্থান ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কোনো বাস্তবসম্মত সমঝোতা হলেও সেটিকে স্বাগত জানানো উচিত। তার মতে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং গাজার মানবিক সংকট নিরসনের প্রয়োজন—দুটিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে সাবেক ইসরায়েলি কূটনীতিক আলন পিঙ্কাস মনে করেন, নেতানিয়াহুর অবস্থানকে আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটেই দেখা উচিত।

তার ভাষায়, নেতানিয়াহুর জন্য ‘চলমান যুদ্ধ’ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তকে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক হিসাব হিসেবে দেখছেন, যেখানে নেতানিয়াহু মনে করছেন—হামাস এখনও নিরস্ত্র হয়নি এবং এই অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকি সীমিত।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর ধাপে ধাপে প্রত্যাহার।

ফলে গাজার যুদ্ধবিরতি ও পরবর্তী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কোন পথে এগোবে, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে পরবর্তী আলোচনার ওপর।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন