অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬

দুটি ফ্লাইট, শত শত প্রাণ, অসংখ্য প্রশ্ন

মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের এমএইচ৩৭০ ও এমএইচ১৭—দুটি ট্র্যাজেডি যেভাবে বদলে দেয় বিশ্ব বিমান চলাচলের ইতিহাস

২০১৪ সালকে বিশ্ব বিমান চলাচলের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার বছরগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের দুটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়। একটি বিমান রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়, অন্যটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়।

একটি ঘটনার রহস্য আজও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি, আর অন্যটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, যুদ্ধ এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে আছে।

এমএইচ৩৭০: ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় নিখোঁজ বিমান

২০১৪ সালের ৮ মার্চ মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে চীনের বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ৩৭০। বোয়িং ৭৭৭-২০০ইআর মডেলের বিমানটিতে ২৩৯ জন আরোহী ছিলেন।

উড্ডয়নের প্রায় ৪০ মিনিট পর বিমানটির সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর বিমানটি রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং আর কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কী ঘটেছিল?

তদন্তে জানা যায়, বিমানটি নির্ধারিত রুট থেকে হঠাৎ ঘুরে মালয় উপদ্বীপ অতিক্রম করে ভারত মহাসাগরের দিকে চলে যায়।

বিমানটির ট্রান্সপন্ডার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। তবে স্যাটেলাইট যোগাযোগের মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বিমানের অস্তিত্বের কিছু প্রযুক্তিগত সংকেত পাওয়া যায়।

এই তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, বিমানটি দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনুসন্ধান অভিযান

এমএইচ৩৭০-এর সন্ধানে মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীনসহ একাধিক দেশ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনা করে।

সমুদ্রের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা তল্লাশি করা হলেও বিমানের মূল ধ্বংসাবশেষ বা ফ্লাইট রেকর্ডার (ব্ল্যাক বক্স) উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল এবং ভারত মহাসাগরের কয়েকটি দ্বীপে বিমানের ডানার অংশসহ কিছু ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার হয়, যেগুলো এমএইচ৩৭০-এর অংশ বলে নিশ্চিত করা হয়।

তদন্তে কী উঠে আসে?

২০১৮ সালে প্রকাশিত মালয়েশিয়ার সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানটির গতিপথ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হলেও কে বা কারা এটি করেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তদন্তকারীরা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করেননি এবং বিমানটি কেন নিখোঁজ হয়েছিল, সে প্রশ্নেরও চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেননি।

এমএইচ১৭: যুদ্ধের আকাশে ধ্বংস

এমএইচ৩৭০ নিখোঁজ হওয়ার মাত্র চার মাস পর, ১৭ জুলাই ২০১৪, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের আরেকটি বোয়িং ৭৭৭ বিমান এমএইচ১৭ নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম থেকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

বিমানটিতে ২৯৮ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন।

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের আকাশ অতিক্রম করার সময় বিমানটি ভূপাতিত হয়। এতে বিমানের সব আরোহী নিহত হন।

আন্তর্জাতিক তদন্ত কী বলেছে?

নেদারল্যান্ডসের নেতৃত্বে গঠিত Joint Investigation Team (JIT) দীর্ঘ তদন্ত শেষে জানায়, বিমানটি রাশিয়ান নির্মিত Buk ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার আঘাতে ভূপাতিত হয়েছিল।

তদন্তে আরও বলা হয়, ক্ষেপণাস্ত্রটি ইউক্রেনের রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

রাশিয়া শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং তদন্তের বিভিন্ন অংশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

আদালতের রায়

২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসের একটি আদালত অনুপস্থিত অবস্থায় তিনজনকে হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে অভিযুক্তদের রাশিয়া প্রত্যর্পণ না করায় রায় কার্যকর হয়নি।

বিমান চলাচলে কী পরিবর্তন এসেছে?

দুটি দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে—

  • বিমান ট্র্যাকিং প্রযুক্তি উন্নত করা হয়েছে।
  • নির্দিষ্ট সময় পরপর বিমানের অবস্থান জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
  • যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ আকাশসীমা এড়িয়ে চলার নির্দেশনা আরও কঠোর করা হয়েছে।
  • আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় এবং ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে।

এখনো রয়ে গেছে অজানা প্রশ্ন

এমএইচ১৭ দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত ও আদালতের রায় থাকলেও এমএইচ৩৭০ আজও আধুনিক বিমান চলাচলের সবচেয়ে বড় রহস্য।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্ল্যাক বক্স এবং বিমানের মূল ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এমএইচ৩৭০-এর প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়।

এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও শত শত স্বজন এখনো অপেক্ষা করছেন একটি নিশ্চিত উত্তরের জন্য—কী হয়েছিল সেই রাতে, আর কেনই বা পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক যাত্রীবাহী বিমানগুলোর একটি কোনো চিহ্ন ছাড়াই হারিয়ে গেল।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনগুলোর সারসংক্ষেপ

  • এমএইচ৩৭০ (৮ মার্চ ২০১৪): ২৩৯ আরোহী নিয়ে নিখোঁজ; দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে ধারণা, তবে মূল ধ্বংসাবশেষ ও ব্ল্যাক বক্স এখনো উদ্ধার হয়নি।
  • এমএইচ১৭ (১৭ জুলাই ২০১৪): ২৯৮ আরোহীসহ ইউক্রেনের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত; আন্তর্জাতিক তদন্তে Buk ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন