অনুসরণ করুন:
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

ইসরায়েলি আটক থেকে মুক্তি পেয়ে গাজায় ফিরলেন ৬০ ফিলিস্তিনি, নির্যাতনের বিভীষিকার বর্ণনা

ইসরায়েলের বিভিন্ন আটককেন্দ্রে দীর্ঘদিন আটক থাকার পর ৬০ জন ফিলিস্তিনিকে গাজায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সোমবার আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (ICRC) তত্ত্বাবধানে তারা দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে পৌঁছান। সেখানে স্বজন ও চিকিৎসকদের সঙ্গে পুনর্মিলনের আবেগঘন মুহূর্তের পাশাপাশি উঠে আসে আটক জীবনের নির্মম অভিজ্ঞতার বর্ণনা।

হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় অনেককেই দুর্বল, অপুষ্ট ও আহত অবস্থায় দেখা যায়। কয়েকজন হুইলচেয়ারে ছিলেন এবং অনেকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারছিলেন না। চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক কষ্টের সুস্পষ্ট প্রভাব তাদের শরীরে বিদ্যমান।

এটি গাজা যুদ্ধ চলাকালে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মুক্তির অন্যতম বড় ঘটনা। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন হামোকেদ (HaMoked)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজা থেকে আটক প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েল “অবৈধ যোদ্ধা” (Unlawful Combatants) হিসেবে আটক রেখেছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মুক্তি পাওয়া ৬০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আর নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা না করায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

আটক জীবনের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা

মুক্তিপ্রাপ্তদের একজন আবদুল্লাহ কিলানি জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে গাজার সালাহ আল-দীন সড়ক থেকে তাকে আটক করা হয়। এরপর তিনি প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় বিভিন্ন আটককেন্দ্রে ছিলেন।

তার ভাষায়, বন্দি অবস্থার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত কঠিন। এক পর্যায়ে তিনি ও আরেক বন্দি গুলিবিদ্ধ হন। মুক্তি পাওয়ার পরও তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে অবশেষে স্বাধীনভাবে পরিবারের কাছে ফিরতে পেরেছেন।

আরেক মুক্তিপ্রাপ্ত, আবু ইব্রাহিম নামে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি জানান, বন্দিদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা খালি কংক্রিটের মেঝে বা লোহার স্ল্যাবের ওপর বসিয়ে রাখা হতো। তার অভিযোগ, কারারক্ষীরা রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করায় তিনি আহত হন। তিনি বলেন, তরুণ ও বৃদ্ধ—কাউকেই আলাদা করে দেখা হতো না; সবার সঙ্গে একই ধরনের কঠোর আচরণ করা হয়েছে।

৪৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ জাবের আল-মাজদালাওয়ি জানান, তিনি প্রায় এক বছর নয় মাস আটক ছিলেন। মুক্তির বিষয়টি তিনি জানতে পারেন কেবল তখনই, যখন তাকে আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তিনি বলেন, আটক অবস্থায় যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এখনও যারা ইসরায়েলি কারাগারে রয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

নির্যাতনের অভিযোগ

মুক্তিপ্রাপ্তদের অভিযোগ অনুযায়ী, আটক অবস্থায় তাদের নিয়মিত মারধর, দীর্ঘ সময় হাত-পা বেঁধে রাখা, পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা এবং অমানবিক পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ

ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, ইসরায়েলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আটককেন্দ্র—বিশেষ করে ওফার, নেগেভ ও স্দে তেইমান—এ বন্দিদের ওপর নিয়মিত নির্যাতন, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা অবহেলা, দীর্ঘ সময় শারীরিকভাবে বেঁধে রাখা এবং বিভিন্ন ধরনের অমানবিক আচরণ করা হয়।

জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইসরায়েলের হেফাজতে আটক ফিলিস্তিনি শিশুদের অনেকেই নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং অন্যান্য দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছে বলে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক রেডক্রসের অবস্থান

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (ICRC) জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে তারা ইসরায়েলে আটক ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ বা তাদের আটক অবস্থার পরিদর্শনের সুযোগ পাচ্ছে না। সংস্থাটি আবারও সব বন্দির অবস্থান জানার এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী তাদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরায়েলের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ ফিলিস্তিনি আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজা যুদ্ধের পাশাপাশি বন্দিদের সঙ্গে আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ওপর কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন