সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে জোর, শিল্পায়ন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের আহ্বান ড. তিতুমীরের

বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিতে উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ এমন বিনিয়োগ প্রত্যাশা করে, যা শুধু মূলধন আনবে না, বরং উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

রোববার রাজধানীতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: বর্ধিত আস্থা ও নতুন দিকনির্দেশনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় শিল্পায়ন হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উৎপাদন অভিজ্ঞতা এবং বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চায়।

তিনি জানান, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পুনর্গঠনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এর জন্য উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ, শিল্পায়ন এবং রপ্তানি সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হলেও চীনা বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও তুলনামূলকভাবে কম। এই ব্যবধান কমাতে বিদ্যমান বাজারসুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং নতুন রপ্তানি পণ্যের প্রসারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, চীনের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা কাজে লাগিয়ে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্যসহ উচ্চ মূল্যসংযোজন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি পেয়ারা ও কাঁঠালের জন্য চীনের বাজার উন্মুক্ত হওয়ার উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে ভবিষ্যতে আরও কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে শিল্প স্থানান্তর এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও জোরদার হবে।

যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. তিতুমীর বলেন, চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, রেল যোগাযোগের উন্নয়ন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি কুনমিং-চট্টগ্রাম মাল্টিমোডাল পরিবহন করিডোর এবং বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর (বিসিএম) বাস্তবায়নের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি দক্ষতা এবং পানি ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, নদীশাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ড্রেজিং প্রযুক্তি এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা যেতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনে চীনের গঠনমূলক ভূমিকা ইতিবাচক। এ বিষয়ে বেইজিংয়ের সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে বাংলাদেশ আশা করে।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক কৌশলগত নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এখন এই সম্পর্কের বাস্তব সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর আরও জোর দিতে হবে।

সেমিনারে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, গবেষক, চীনা বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন