বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

গাজা যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে নেতানিয়াহু, চুক্তির চাপে ট্রাম্প

২১ মাসের যুদ্ধে ক্লান্ত গাজা, মানবিক সংকটে দগ্ধ মানুষের আর্তি

বিবিসির রিপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে

২১ মাসের যুদ্ধের পর গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতির নতুন সম্ভাবনার আলো দেখা দিচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন তিনি।

ট্রাম্প এর আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি “খুবই কঠোরভাবে” কথা বলেছেন যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে। তার আশা, “এই সপ্তাহেই একটি চুক্তি হবে।”

নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে উড়ে যাওয়ার আগে বলেন, “যে চুক্তির আলোচনা চলছে, সেটি আমাদের নির্ধারিত শর্তের ভিত্তিতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এই চুক্তিকে এগিয়ে নিতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি, যা আমাদের সবার প্রত্যাশা।”

দোহায় ফের আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও বন্দিমুক্তির প্রস্তাব নিয়ে আবারো পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে কাতারের রাজধানী দোহায়। তবে চুক্তির পথে যেসব গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেগুলো এবারো অতিক্রম করা যাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

গাজায় প্রতিদিনের ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ক্লান্ত ফিলিস্তিনিরা এই আলোচনা নিয়ে সাবধানী আশাবাদী। অন্যদিকে, হামাসের হাতে আটক থাকা ইসরায়েলি বন্দীদের পরিবারও চুক্তির জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

উত্তর গাজা থেকে গাজা সিটিতে পালিয়ে যাওয়া নাবিল আবু দাইয়াহ বলেন, “আমি যুদ্ধবিরতি চাই না, চাই যুদ্ধের সম্পূর্ণ সমাপ্তি। সোজা কথা, আমি ভয় পাই, ৬০ দিন পর আবার যুদ্ধ শুরু হবে। আমরা বারবার স্থানান্তরিত হতে হতে ক্লান্ত হয়ে গেছি, পানি নেই, খাবার নেই, তাবুতে বেঁচে আছি। জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বলতে কিছুই নেই।”

শনিবার রাতে ইসরায়েল সরকারের প্রতি চুক্তি করতে আহ্বান জানিয়ে বড় মিছিল হয়েছে। প্রায় ৫০ জন বন্দীর মুক্তির দাবিতে স্বজনেরা সমাবেশে অংশ নেন, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইলাই ডেভিড, যার ছোট ভাই এভিয়াতার হামাসের হাতে বন্দি, সমাবেশে বলেন, “এখনই সময় জীবন বাঁচানোর। বন্দীদের মৃতদেহগুলোও যেন হারিয়ে না যায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।”

নেতানিয়াহুর কঠিন সমীকরণ

নেতানিয়াহু গত ছয় মাসে তৃতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউজ সফরে গেলেন। তবে এটি তার প্রথম সফর যেখানে ইসরায়েল-ইরানের সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং তারপরের যুদ্ধবিরতির বাস্তবতা প্রভাব ফেলছে।

ইরানের ওপর ১২ দিনের সামরিক অভিযানের পর ইসরায়েলি জনমতে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কিছুটা ফিরেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে তিনি তার ডানপন্থী জোটের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও গাজা নিয়ে চুক্তিতে যেতে কিছুটা বেশি প্রভাবশালী অবস্থানে আছেন। ডানপন্থীরা গাজা পুরোপুরি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণেই রাখতে চায়।

ইরানে হামলার কারণে হামাসও চাপের মুখে পড়েছে, কারণ ইরান অঞ্চলটির অন্যতম বড় পৃষ্ঠপোষক। তাই চুক্তির পথে হামাস কিছুটা নমনীয় হতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ট্রাম্প দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অগ্রাধিকারে যেতে চাইছেন। এর মধ্যে আছে ইসরায়েল-সিরিয়া সীমান্ত নিয়ে আলোচনা, ইসরায়েল-সৌদি আরব সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এবং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন পারমাণবিক চুক্তির আলোচনা।

কী নিয়ে দ্বন্দ্ব?

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মূল দ্বন্দ্ব একই জায়গায়। ইসরায়েল কেবল অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে রাজি, চায় না যুদ্ধের পুরোপুরি অবসান। হামাস চায় যুদ্ধ চিরতরে থামুক এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি সরে যাক।

হামাসের কাছে শেষ প্রস্তাবে ওয়াশিংটনের গ্যারান্টি এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আলোচনা অব্যাহত রাখার আশ্বাস রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, হামাস প্রথম দিনে আটজন জীবিত বন্দী মুক্তি দেবে। তার পর ইসরায়েলি বাহিনী গাজার উত্তরের অংশ থেকে সরে আসবে। এক সপ্তাহ পর সেনারা দক্ষিণ থেকেও সরে যাবে। ১০তম দিনে হামাস জানাবে আর কে কে জীবিত বন্দী আছেন এবং তাদের অবস্থা কী।

এদিকে, ইসরায়েল ২০০০-এর বেশি গাজাবাসীকে নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দেবে, যারা প্রশাসনিক বন্দিত্বে আটক, অর্থাৎ বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েলি বন্দীদের ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।

হামাসের আপত্তি

ট্রাম্প এটিকে “চূড়ান্ত” যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, ইসরায়েল “প্রয়োজনীয় শর্ত” মেনে নিয়েছে। তবে হামাস বলেছে, তারা “ইতিবাচক মনোভাব” দেখিয়েছে, যদিও কিছু আপত্তি রয়েছে।

এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা জানান, গাজায় মানবিক সাহায্য নিয়ে এখনো দ্বন্দ্ব রয়েছে। হামাস চায়, বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (GHF)-এর কার্যক্রম দ্রুত বন্ধ হোক এবং জাতিসংঘ ও তাদের অংশীদারদের হাতে ত্রাণ কার্যক্রম পুরোপুরি ফিরিয়ে দেওয়া হোক। এছাড়া, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সময়সূচি এবং মিসরের সঙ্গে রাফা ক্রসিং পরিচালনা নিয়েও হামাসের প্রশ্ন রয়েছে।

নেতানিয়াহুর অফিস জানিয়েছে, হামাসের চাওয়া পরিবর্তনগুলো ইসরায়েলের কাছে “গ্রহণযোগ্য নয়”। নেতানিয়াহু একাধিকবার বলেছেন, হামাসকে নিরস্ত্র করতেই হবে, তবে হামাস এখনো এ নিয়ে কোনো আলোচনা করতে চায়নি।

যুদ্ধ থামাতে জনমত চায় চুক্তি

গাজা যুদ্ধে নিহত ইসরায়েলি সেনার সংখ্যা গত এক মাসেই ২০ পেরিয়ে গেছে। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির বলেছেন, “যুদ্ধের লক্ষ্য প্রায় পূরণ হয়েছে,” এবং এখন সরকারের সামনে সিদ্ধান্ত—চুক্তির পথে এগোবে, নাকি আবার গাজায় সামরিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নেবে।

এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইসরায়েলিরাই চায় চুক্তি হোক এবং বন্দীরা ঘরে ফিরুক।

অন্যদিকে, গাজায় কিছু মানুষ সন্দেহ করছেন, নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময়ই এই ইতিবাচক আবহ তৈরি করা হচ্ছে, যেমনটি মে মাসে ঘটেছিল ট্রাম্প আরব গালফ সফরের আগে।

মানবিক সংকট চরমে

গাজার পরিস্থিতি ক্রমেই শোচনীয় হয়ে উঠছে। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টি দেখা দিচ্ছে। জাতিসংঘ বলছে, টানা চার মাস ধরে গাজায় কোনো জ্বালানি প্রবেশ করছে না। ফলে হাসপাতাল, পানি সরবরাহ আর যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে।

এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে আক্রমণের পর, যেখানে প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে বন্দী করা হয়। তার জবাবে ইসরায়েল গাজায় আক্রমণ চালায়। হামাস-চালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে, গাজায় এ পর্যন্ত ৫৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এই সংখ্যা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করছে। (সূত্র: BBC, UN)


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন