রবিবার, ১০ মে ২০২৬

পাল্টা শুল্কের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে, দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নীতির প্রভাবে দেশটির বাজারে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর সুযোগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসে বাংলাদেশ। মার্চ শেষে সেই অবস্থান আরও কিছুটা সুসংহত হয়েছে। তবে বাজারে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম।

অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল–এর প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি–মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ পাঁচ পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে শুধু ভিয়েতনামের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অন্যদিকে চীন, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত—এই চার দেশের রপ্তানি কমেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ১ হাজার ৭৭৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ কম।

এই সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ২০৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ কম। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি ছিল ৮২০ কোটি ডলার।

অন্যদিকে চীনের রপ্তানিতে বড় ধস নেমেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি ১৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫৩ শতাংশ কম। গত বছরের একই সময়ে চীনের রপ্তানি ছিল ৩৬১ কোটি ডলার।

বাজারটিতে শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনাম চলতি বছরের জানুয়ারি–মার্চ সময়ে ৩৯৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। তাদের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারের প্রায় ২২ শতাংশ হিস্যা ভিয়েতনামের দখলে রয়েছে। বাংলাদেশের হিস্যা প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ।

একই সময়ে ইন্দোনেশিয়া ১২২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য কম। গত বছর একই সময়ে দেশটির রপ্তানি ছিল ১২৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি কমেছে মাত্র দশমিক ১৩ শতাংশ।

অন্যদিকে ভারতের রপ্তানি কমেছে আরও বেশি হারে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি ১১০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি ছিল ১৫১ কোটি ডলার। সে হিসাবে ভারতের রপ্তানি কমেছে প্রায় ২৭ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। যদিও তা ৯ এপ্রিল কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, পরে তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। এরপর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।

প্রথমদিকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও পরে তা কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছে বাংলাদেশ। এতে পাল্টা শুল্ক কমে ২০ শতাংশে দাঁড়ায় এবং গত ৭ আগস্ট তা কার্যকর হয়।

এরপর পাল্টা শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ একটি পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করে ৯ ফেব্রুয়ারি। ওই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ওপর শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তবে ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত পাল্টা শুল্ককে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে। পরে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগ করে নতুন করে সব দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়।

তবে গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত দুটি বেসরকারি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রে এই শুল্ক স্থগিত করেন।

শুরুতে পাল্টা শুল্ক নিয়ে বেকায়দায় থাকলেও পরে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে বাংলাদেশ। কারণ বাংলাদেশের মতো ভিয়েতনামের শুল্কহার ছিল ২০ শতাংশ, বিপরীতে ভারতের পণ্যে মোট শুল্কহার দাঁড়ায় ৫০ শতাংশ এবং চীনের শুল্ক আরও বেশি হয়। ফলে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক, জুতা ও অন্যান্য পণ্যের ক্রয়াদেশ কিছুটা বাড়ে।

তবে সেই ইতিবাচক ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি বলে জানিয়েছেন পোশাক রপ্তানিকারকেরা। তাদের মতে, শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ–পরবর্তী জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন ক্রয়াদেশও হ্রাস পেয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন