রবিবার, ১০ মে ২০২৬

সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি

মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত এই দুই দেশ এখন জ্বালানি নীতি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, ইসরায়েল-ইরান ইস্যু এবং বিভিন্ন সংঘাতে বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বের শেকড় অনেক পুরোনো। ১৯৫০-এর দশকের ‘বুরাইমি বিরোধ’ থেকে শুরু করে বর্তমান ওপেক সংকট পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। ঐতিহাসিক সেই বিরোধে সৌদি আরব মরূদ্যানসমৃদ্ধ একটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিল, যেখানে বিপুল তেলের মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হতো। পরবর্তীতে এই বিরোধ দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি করে।

বর্তমানে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে জ্বালানি বাজারকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আরব আমিরাত। আবুধাবি জানিয়েছে, তারা এখন আরও বেশি তেল উত্তোলন করবে। বিশ্লেষকদের মতে, আরব আমিরাত দ্রুত তেল বিক্রি করে স্বল্পমেয়াদে বেশি মুনাফা করতে চায়। অন্যদিকে সৌদি আরব দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে উৎপাদন সীমিত রাখার কৌশলে বিশ্বাসী।

তবে বিরোধ কেবল তেলনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। আঞ্চলিক সংঘাতগুলোতেও দুই দেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে ভিন্ন। সুদান, ইয়েমেন ও লিবিয়ার মতো দেশগুলোতে সৌদি আরব এবং আমিরাত ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। বিশেষ করে ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান নিয়ে রিয়াদের উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আরব আমিরাত এখন নিজেকে ছোট একটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চায় না। বরং তারা নিজেদের একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও কৌশলগত শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। অন্যদিকে সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের ‘স্বাভাবিক নেতা’ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চায়।

ইসরায়েল ইস্যুতেও দুই দেশের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ২০২০ সালে আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও সৌদি আরব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সেই পথে হাঁটেনি। গাজা যুদ্ধের পর সৌদি জনমতের বড় অংশ ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় রিয়াদ আরও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

একইসঙ্গে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনাও দুই দেশের দূরত্ব বাড়িয়েছে। আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করছে, অন্যদিকে সৌদি আরব তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানকে নিয়ে নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের এই প্রতিযোগিতা আগামী বছরগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও পড়বে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন