কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের লড়াই ছাড়িয়ে নির্বাচনের গুরুত্ব এখন সাংবিধানিক ভারসাম্য, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ও জনগণের রায় মেনে নেওয়ার প্রশ্নে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি দেশটির সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্য, রাষ্ট্রপতির জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়েরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নির্বাচনী উদ্যোগ, আদালতের হস্তক্ষেপ, কংগ্রেসের সম্ভাব্য নজরদারি এবং নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার প্রশ্ন—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন মার্কিন গণতন্ত্রের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে।
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে মূল প্রশ্ন হলো, মার্কিন সংবিধানের ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতাকে কতটা সীমিত করতে পারে, নির্বাচনী কর্মকর্তারা রাজনৈতিক চাপ কতটা দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করতে পারেন এবং ফলাফল নিজেদের অনুকূলে না গেলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনগণের রায়কে কতটা সম্মান জানায়।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে আইনি লড়াই
ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিবর্তনের বিভিন্ন উদ্যোগ আদালতের বাধার মুখে পড়েছে। ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের ২০ অক্টোবরের একটি পর্যালোচনা অনুযায়ী, অন্তত ৩৪টি ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ সাময়িক বা স্থায়ীভাবে আটকে দিয়েছেন। এসব উদ্যোগের মধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ভোটার নিবন্ধনের নথিপত্র চাওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
আদালতের এসব সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিচারকদের রায় রয়েছে। এমনকি ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া বিচারকেরাও প্রশাসনের কিছু উদ্যোগের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।
এ পরিস্থিতি দেখায়, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর বিচারিক নজরদারি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বারবার মামলা করার প্রয়োজনীয়তা নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে। বিতর্কিত কোনো নীতি কার্যকর হওয়ার পর আদালত হস্তক্ষেপ করলেও নির্বাচনের আগে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা দূর করতে রাজ্যগুলোকে সময় ও সম্পদ ব্যয় করে আইনি লড়াই চালাতে হয়।
গত ২৬ অক্টোবর একটি ফেডারেল আপিল আদালত ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় ২০ হাজার নিবন্ধিত ভোটারের ব্যালট আলাদা করে রাখা বা স্থগিত করার আবেদন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ অভিযোগ করেছিল, ওই ভোটারদের কেউ কেউ মার্কিন নাগরিক নাও হতে পারেন। তবে আদালত মনে করেন, সরকারের আবেদনের যথাযথ বিবেচনার জন্য নিম্ন আদালতকে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে মূল বিরোধটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি তখনো হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন এসব পদক্ষেপকে নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও সততা রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অনিয়ম তদন্ত করা এবং অপ্রমাণিত সন্দেহের ভিত্তিতে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার সীমিত করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নির্ভুল ভোটার তালিকা যেমন জরুরি, তেমনি বৈধ ভোটারদের অন্যায্যভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে না ফেলাও গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ বারবার উঠতে থাকলে, প্রমাণ না থাকলেও, নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে নিয়মমাফিক প্রশাসনিক কার্যক্রমও সাধারণ মানুষের কাছে সন্দেহজনক হয়ে উঠতে পারে।
সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষায় কংগ্রেসের ভূমিকা
বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারির ধরন ও পরিধিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের নীতি তদন্ত, শীর্ষ কর্মকর্তাদের তলব এবং নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার ক্ষেত্রে বাড়তি ক্ষমতা পাবেন। অভিবাসননীতি, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, ফেডারেল সরকারের ব্যয় এবং নির্বাহী আদেশের বাস্তবায়নের মতো বিষয় আরও কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে পারে।
তদন্তের মাধ্যমে প্রশাসনিক অনিয়মের তথ্য জনসমক্ষে আসতে পারে এবং নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করা যেতে পারে। তবে তদন্ত বা শুনানি হলেই যে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে, তা নয়। সমন জারির পর দীর্ঘ আইনি বিরোধ তৈরি হতে পারে, আর কংগ্রেসের শুনানির মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নীতি পরিবর্তন করানোও সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বিচারক ও প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়াতে পারে। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা ও নির্বাহী কর্তৃত্ব বহাল থাকবে। ফলে কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচি স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যাবে না।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কংগ্রেস তার সাংবিধানিক দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করবে কি না। কোনো রাজনৈতিক দল যদি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
নির্বাচনের পর ফল মেনে নেওয়ার পরীক্ষা
নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতি এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে।
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং কারচুপির অভিযোগ তুলেছিলেন। জর্জিয়ার নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট খুঁজে বের করার চাপ দেওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর পরিণতিতে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল অনুমোদনের সময় ট্রাম্প-সমর্থকেরা ক্যাপিটল ভবনে সহিংস হামলা চালান।
অতীতের এই ঘটনা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে ২০২৬ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে। তবে এটি নির্বাচনী বিরোধ ও রাজনৈতিক চাপের বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ভোট গণনায় বারবার আপত্তি তোলা, অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি, ধারাবাহিক তদন্তের দাবি এবং নিয়মমাফিক নির্বাচনী কার্যক্রমকে কারচুপির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা। এসব পদক্ষেপ নির্বাচনের ফল চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে পারে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা দুর্বল করতে পারে।
প্রার্থীদের বৈধ আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর অধিকার রয়েছে। আদালতের দায়িত্ব বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ যাচাই করা এবং নথিবদ্ধ অনিয়ম থাকলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা করা। তবে অভিযোগ নিজেই প্রমাণ নয়, আর কোনো প্রেসিডেন্টের অপছন্দের কারণে বৈধ নির্বাচনী ফল বাতিল করার ক্ষমতাও নেই।
নির্বাচনে সরাসরি কারচুপি না ঘটলেও নির্বাচনকর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো, ভিত্তিহীন সন্দেহ ছড়ানো এবং প্রতিষ্ঠিত নিয়মকে পরিকল্পিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বৈধ আইনি নজরদারি ও অসৎ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
বিচার বিভাগ একা গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারে না
আদালতের রায় নির্বাহী বিভাগের বেআইনি পদক্ষেপ ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে হাজার হাজার নির্বাচনী এলাকার ভোট পরিচালনা বা প্রতিটি নির্বাচনী কর্মকর্তা আদালতের নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করছেন কি না, তা এককভাবে নিশ্চিত করা বিচার বিভাগের পক্ষে সম্ভব নয়।
একইভাবে, নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ করার পর কেবল কয়েকটি আদালতের রায়ের মাধ্যমে জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন। কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য কংগ্রেসের নজরদারি, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নির্ভুল ভোট গণনা, আদালতের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ফল মেনে নেওয়ার সদিচ্ছা—সবই প্রয়োজন।
উভয় দলের প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিচারকদের প্রশাসনের বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার ঘটনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব দলীয় আনুগত্যের অধীন নয়। ক্ষমতায় কে লাভবান হচ্ছে, তা বিবেচনা না করে সবার জন্য একই আইন প্রয়োগ করাই সাংবিধানিক ব্যবস্থার ভিত্তি।
প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের ঝুঁকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বারবার কৃত্রিম সংঘাত তৈরি হলে জনআস্থা দুর্বল হয়, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে ক্ষমতার পথে বাধা হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়তে পারে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের চেয়েও বড় প্রশ্ন
রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসন আইনসভার সমর্থন পেতে পারে, যদিও আদালত ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের আইনি নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়তে পারে। তবে কোনো ফলাফলই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদর্শ সাংবিধানিক শাসনের নিশ্চয়তা দেয় না।
শেষ পর্যন্ত নির্ধারক বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব কতটা সততার সঙ্গে পালন করছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমাহীন নয়—এই নীতি কতটা মেনে নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র দীর্ঘ ইতিহাসে বহু সংকট অতিক্রম করেছে। তবে সেই অভিজ্ঞতা থেকে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তখনই কার্যকর থাকে, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো তা নিষ্ঠার সঙ্গে রক্ষা করে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারিত সীমার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে।
এ কারণে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণের বিষয় নয়। প্রতিটি ভোট সঠিকভাবে গণনা করা হচ্ছে কি না, নির্বাচনী বিরোধ আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি হচ্ছে কি না এবং চূড়ান্ত ফল দলীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে মেনে নেওয়া হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই মার্কিন গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির পরিচয় মিলবে।

