মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বদলাতে পারে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি

ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেনে সহায়তা, ইসরায়েলকে সামরিক সমর্থন ও বৈদেশিক ব্যয় নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা; কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট লড়াই।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তার মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। তবে এবারের নির্বাচনের প্রভাব শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর মধ্য দিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক ব্যয়, বৈদেশিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত মোকাবিলার কৌশলেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের ব্যয়, জ্বালানির উচ্চমূল্য, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির ওপর তাদের প্রভাব বাড়তে পারে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রশাসনের বর্তমান নীতিগুলো এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২৫ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেনকে সহায়তা, ইসরায়েলের প্রতি সামরিক সমর্থন এবং সামরিক ও বৈদেশিক সহায়তা বাজেট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পথ তৈরি হতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হলেও কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ এবং উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হয়।

কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন, প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের ওপর এক ধরনের রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবেও দেখা হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো যাচাই-বাছাই এবং বিভিন্ন নীতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা কংগ্রেসের ভোট, আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

ইরান যুদ্ধের লাগাম টানার চেষ্টা

ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে কংগ্রেসের অনুমোদন না নেওয়ায় ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা যুদ্ধ বন্ধে একাধিকবার প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার সমর্থন পেলেও ট্রাম্প প্রশাসন তা উপেক্ষা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ভালো ফল করলে ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় প্রশাসনের ক্ষমতার ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করতে পারেন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে তাঁরা প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে চাপ সৃষ্টি, যুদ্ধের পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা এবং সামরিক অভিযানের বিষয়ে জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারেন।

প্রতিরক্ষা ব্যয় ও সামরিক কার্যক্রমের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বাড়লে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নতুন রাজনৈতিক বাধা তৈরি হতে পারে। এ কারণে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইউক্রেনের জন্য নতুন সহায়তার সুযোগ

রাশিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করতে ইউক্রেনকে সহায়তার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দুই দলেরই অনেক আইনপ্রণেতা সমর্থন জানিয়েছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনকে সরাসরি মার্কিন আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশ বজায় রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তও কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্যের সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাঁদের মধ্যে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারাও রয়েছেন।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ইউক্রেনকে নতুন সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব সামনে আনার সুযোগ বাড়তে পারে। কংগ্রেসের কার্যসূচি নির্ধারণ ও বিভিন্ন প্রস্তাবে ভোটের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কোনো প্রস্তাব পাস হলেও প্রেসিডেন্টের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভেটো অতিক্রম করতে সাধারণত কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। ফলে ইউক্রেনকে সহায়তার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য উদ্যোগের সাফল্য কংগ্রেসের আসনসংখ্যা ও দলীয় সমর্থনের ওপর নির্ভর করবে।

ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা সীমিত করার বিতর্ক

গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি, অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে রিপাবলিকানদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলকে সমর্থন করার বিষয়ে মতপার্থক্য বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তা সীমিত করা বা তা নিয়ে নতুন শর্ত আরোপের উদ্যোগ নিতে পারেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান অর্থবছরে ইসরায়েলের জন্য মার্কিন সহায়তার পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সামরিক সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এ অর্থ নিয়ে কংগ্রেসে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

তবে সামরিক সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ করা হবে কি না, তা নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি আইনপ্রণেতাদের অবস্থান, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনের নীতির ওপর নির্ভর করবে।

সামরিক ব্যয় ও বৈদেশিক সহায়তায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা

ট্রাম্প প্রশাসন চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার প্রস্তাব দিয়েছিল। ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে পরামর্শ না করা এবং সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যয় কমানোর পরিকল্পনার সমালোচনা করে ডেমোক্র্যাটরা প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছেন।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সামরিক ব্যয়ের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই এবং বরাদ্দ সীমিত করার চেষ্টা জোরদার হতে পারে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের আটকে রাখা বা বাতিল করা বৈদেশিক সহায়তার তহবিল পুনরায় চালুর উদ্যোগও নিতে পারেন তাঁরা।

বৈদেশিক সহায়তার অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, সে বিষয়ে নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়ানোর দাবিও সামনে আসতে পারে। তবে বাজেটসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে কংগ্রেসের অনুমোদন এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে কী হতে পারে

অন্যদিকে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির বর্তমান অবস্থান এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আলোচিত সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে কঠোর অবস্থান এবং বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ব্যয়ে আরও কড়াকড়ি।

রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়া সহজ হতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ, নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির বিষয়ে কঠোর অবস্থানের পক্ষে কংগ্রেসে সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।

এ ছাড়া ইউক্রেনসহ অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মার্কিন অর্থায়নের ওপর কঠোর নজরদারি, আন্তর্জাতিক ও সরকারি সংস্থায় ব্যয় পর্যালোচনা এবং বৈদেশিক সহায়তার ক্ষেত্রে নিরীক্ষা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ও বাণিজ্যে কঠোরতা

রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিও আরও জোরালো হতে পারে। এ নীতির আওতায় বহুপাক্ষিক চুক্তির চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং নতুন শুল্ক আরোপের মতো বিষয়ে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে অভিবাসন নীতিতেও আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

বৈদেশিক সহায়তার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে পারেন। পাশাপাশি রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষের বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বিভিন্ন কার্যক্রমের ব্যয় মেটানোর নীতিও আলোচনায় থাকতে পারে।

পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির যোগসূত্র

ইরান যুদ্ধের ব্যয়, জ্বালানির মূল্য, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের মতো অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিষয়গুলো এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ, সামরিক সহায়তা ও বৈদেশিক ব্যয় নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রভাবও ভোটারদের মূল্যায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি ও ব্যয়ের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। আর রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে বর্তমান প্রশাসনের প্রতিরক্ষা, অভিবাসন ও বাণিজ্যনীতির পক্ষে আইন প্রণয়নের সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে নির্বাচনের ফলই একমাত্র নির্ধারক নয়। কংগ্রেসের ভেতরে দলীয় ঐক্য, আইন পাসের জন্য প্রয়োজনীয় ভোট, প্রেসিডেন্টের ভেটো এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ নির্ধারিত হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন