সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

দুই পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে ১০২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ

বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় খোলাবাজারে বিক্রিসহ নানা অনিয়ম শনাক্ত; রিয়াজ নিটওয়্যারের বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি, লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে প্রায় ৮ কোটি টাকার ফাঁকি

বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাপড় অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি, রপ্তানিমূল্য কম দেখানোসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে দুই পোশাক কারখানা ১০২ কোটি ৫৭ লাখ ১৩ হাজার ১২৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) পৃথক তদন্তে এসব অনিয়ম উদ্‌ঘাটন করেছে।

এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ এ তথ্য জানানো হয়। তদন্তে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান দুটি হলো রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ও লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেড। এর মধ্যে রিয়াজ নিটওয়্যারের বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা এবং লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে এনবিআর।

কারখানা ও গুদাম পরিদর্শনে অনিয়ম শনাক্ত

এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সিআইসির তদন্ত দল প্রতিষ্ঠান দুটির কারখানা ও গুদাম সরেজমিনে পরিদর্শন করে কাঁচামালের মজুদ যাচাই করেছে। পাশাপাশি আমদানি ও রপ্তানির তথ্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে অনিয়ম শনাক্ত করা হয়।

তদন্তে দেখা গেছে, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড়ের উল্লেখযোগ্য অংশ কারখানার গুদামে পাওয়া যায়নি। এসব কাপড়ের রপ্তানি-সংক্রান্ত হিসাবও পাওয়া যায়নি। তদন্ত দলের ধারণা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে কাপড় সরিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে।

রিয়াজ নিটওয়্যারে ৯৪ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেড ৪১টি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) আওতায় বন্ড সুবিধায় ২ হাজার ৮৬২ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২৩৭ টন বা ৭৮ শতাংশ কাপড় কারখানার গুদামে পাওয়া যায়নি। রপ্তানির নথিতেও এসব কাপড়ের হিসাব পাওয়া যায়নি।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি-সংক্রান্ত নথিতে সুতা ও নিট কাপড়ের হিসাব থাকলেও ওভেন পলিয়েস্টার কাপড়ের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যেসব ৩১টি ইউডির বিপরীতে কোনো রপ্তানি হয়নি, সেগুলোর মধ্যে ৩০টিতেই আমদানি করা কাপড়ের পুরোটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, আংশিক রপ্তানি হওয়া ১০টি ইউডিতেও আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৫৩ শতাংশের হিসাব পাওয়া যায়নি।

পরিদর্শনের সময় পুরো কারখানায় ৬৯ হাজার ৩৮২ কেজি সুতা, ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯৭ পিস তৈরি পোশাক এবং মাত্র ২৫ হাজার ৫৩৩ দশমিক ৫০ কেজি ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় পাওয়া যায়। উদ্ধার হওয়া কাপড়ের পরিমাণ মোট আমদানির মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ।

এনবিআরের হিসাবে, অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি উদ্‌ঘাটন করা হয়েছে।

লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ

অন্যদিকে, লিশা টেক্সের বন্ড সুবিধায় আমদানি করা প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার কেজি পলিয়েস্টার কাপড় কারখানায় পাওয়া যায়নি। তদন্তে এসব কাপড় বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে সরিয়ে খোলাবাজারে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে এনবিআর। শুধু এ খাতেই প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি শনাক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনুমোদনের চেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি এবং চুক্তিমূল্যের তুলনায় কম রপ্তানিমূল্য দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। ইউডির বাইরে স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ না করার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।

কিট ব্যাগ সরবরাহে মূসক ফাঁকির তথ্য

এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চার লাখের বেশি পিস পোশাকের আনুষঙ্গিক কাঁচামাল অনুমোদন ছাড়াই এবং মূসক পরিশোধ না করে স্থানীয় বাজার থেকে কেনা হয়েছে বলে তদন্তে পাওয়া গেছে।

পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার কিট ব্যাগ সরবরাহের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ফাঁকি দেওয়ার তথ্যও শনাক্ত করা হয়েছে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে মোট ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদ্‌ঘাটন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর।

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে অভিযান অব্যাহত

এনবিআর জানিয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ এবং রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত করতে সিআইসির এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন