শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

কক্সবাজার ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ রোধে ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ

যাত্রী আহত ও ট্রেনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় পর্যটক এক্সপ্রেসের একটি বগিতে চার ক্যামেরা; পরীক্ষামূলক উদ্যোগ সফল হলে অন্য ট্রেনেও বসানোর পরিকল্পনা

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বারবার ঘটছে। এতে যাত্রীরা আহত হওয়ার পাশাপাশি ট্রেনের জানালার কাচও ভাঙছে। এ ধরনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পরীক্ষামূলকভাবে পর্যটক এক্সপ্রেসের একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বগিতে চারটি ক্লোজড-সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরা স্থাপন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বগিটির দুই পাশে দুটি করে ক্যামেরা বসানো হয়। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. মামুনুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, আপাতত একটি কোচে পরীক্ষামূলকভাবে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এ পরীক্ষা সফল হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ট্রেনেও ক্যামেরা বসানো হবে।

পাথর নিক্ষেপে বারবার আহত হচ্ছেন যাত্রীরা

গত ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পান ৩৯ বছর বয়সী যাত্রী শাহীন আহমেদ। প্রাথমিক চিকিৎসার পরও তাঁর রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় ট্রেনে থাকা এক চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ট্রেনটির সাধারণত শুধু চট্টগ্রামে যাত্রাবিরতি করার কথা থাকলেও পথিমধ্যে থামিয়ে উত্তরার বাসিন্দা শাহীন আহমেদকে বোয়ালখালীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এর আগে একই বছরের ২৭ এপ্রিল চকরিয়ায় ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় তিন যাত্রী আহত হন। তাঁদের একজনের চারটি দাঁত ভেঙে যায়। এ ছাড়া ১৭ জানুয়ারি কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেসে ছোড়া পাথরের আঘাতে আহত হয় নয় বছর বয়সী এক শিশু।

বারবার জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হলেও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। এতে যাত্রীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং ট্রেনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত কক্সবাজার রুটের ট্রেন

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে পূর্বাঞ্চলে পাথর নিক্ষেপের মোট ২২৪টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি ঘটনা ঘটেছে ঢাকা-কক্সবাজার রুটের বিরতিহীন দুটি ট্রেনে।

পর্যটক এক্সপ্রেস লক্ষ্য করে ২৪ বার এবং কক্সবাজার এক্সপ্রেস লক্ষ্য করে ১৯ বার পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে। এ কারণে সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের শিকার শীর্ষ পাঁচটি ট্রেনের তালিকায় রয়েছে এ দুটি ট্রেন।

প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। বর্তমানে এ রুটে প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।

শত শত ঘটনায় মামলা মাত্র ১১টি, গ্রেপ্তার তিনজন

পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় রেলওয়ে পুলিশ এখন পর্যন্ত মাত্র ১১টি মামলা করেছে এবং গ্রেপ্তার করতে পেরেছে তিনজনকে। এর আগে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তথ্যদাতাদের জন্য আর্থিক পুরস্কার ঘোষণাও করেছিল রেল কর্তৃপক্ষ।

১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী, যাত্রীদের বিপদের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তি ট্রেনের দিকে কিছু নিক্ষেপ করলে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বনিম্ন ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। তবে বাস্তবে এ আইনের প্রয়োগ সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কক্সবাজারের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিহাব জিসান অনিক টিবিএসকে বলেন, পাথরের আঘাতে আহত হওয়ার আতঙ্ক নিয়ে তাঁকে প্রতি সপ্তাহে চট্টগ্রামে যাতায়াত করতে হয়।

তিনি বলেন, তাঁর চোখের সামনেই ট্রেনের বগিতে পাথর নিক্ষেপের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি না করা পর্যন্ত রেলপথ নিরাপদ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, সিসিটিভি স্থাপন ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও অপরাধীদের শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এর কার্যকারিতা সীমিত থাকবে।

একটি বগির ক্যামেরায় পুরো ঘটনা ধরা পড়ছে না

চট্টগ্রামে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশিকুর রহমান জানান, ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগটি এখনো গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি টিবিএসকে বলেন, একটি ট্রেনের এসি কোচে দুই পাশে চারটি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। কোচের ভেতরে হার্ডডিস্ক, কেবল, ডিসপ্লেসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হয়েছে।

আশিকুর রহমান জানান, কয়েক দিন আগে পাহাড়তলীতে পাথর নিক্ষেপের একটি ঘটনা সরাসরি ক্যামেরায় ধরা না পড়লেও ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে। তবে ৪০০ থেকে ৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি ট্রেনের মাত্র একটি বগিতে ক্যামেরা থাকায় পুরো ঘটনার দৃশ্য ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ট্রেনের সামনে ও পেছনেও ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যবেক্ষণের পর এমনভাবে ক্যামেরা স্থাপনের সুপারিশ করা হবে, যাতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র ধারণ করা যায়।

নতুন রেলপথে পাথর নিক্ষেপ বেশি, বলছে পুলিশ

চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজন কান্তি দে বলেন, সাধারণত নতুন রেলপথগুলোতে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি দেখা যায়। তাঁর মতে, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু-কিশোরেরা কৌতূহলবশত এমন কাজ করে। এ ছাড়া মাদকাসক্ত ব্যক্তিদেরও এ ধরনের ঘটনায় জড়িত থাকতে দেখা যায়।

তিনি জানান, অন্য রুটের তুলনায় কক্সবাজার রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটে। বিশেষ করে ডুলাহাজারা, চকরিয়া, রামু ও ইসলামাবাদ এলাকায় এমন ঘটনা বেশি দেখা যায়।

ওসি সুজন কান্তি দে বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হয়। ট্রেনে ক্যামেরা স্থাপন করা হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং পাথর নিক্ষেপের স্থান সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সহজ হবে বলে আশা করছেন তিনি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন