ভয়ভীতি ও পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থেকে আইনি সেবা দেওয়ার আহ্বান; সারদায় প্রশিক্ষণ শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেন ২৪৬ নবীন পুলিশ কর্মকর্তা
মানুষকে সেবা দিয়ে এবং জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই ‘জনগণের পুলিশ’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, পুলিশের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। তাই সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সেবায় পুলিশকে আরও আন্তরিক হতে হবে। ভয়ভীতি ও পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণকে আইনি সেবা ও সুরক্ষা দিতে হবে।
আজ সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ)-এর ছয় মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পুলিশ পুনর্গঠনে বহুমুখী পদক্ষেপ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভঙ্গুর পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করে দক্ষ, আধুনিক, মানবিক ও সেবামুখী বাহিনীতে রূপান্তর করতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, জনবল বৃদ্ধি, যানবাহন ক্রয়, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
নবীন কর্মকর্তাদের বৈষম্য ও অন্যায় থেকে দূরে থাকার নির্দেশ
নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের প্রতীক্ষা, আইনি প্রক্রিয়া ও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এই ব্যাচের সদস্যরা দেশসেবার মহান পেশায় যোগ দিয়েছেন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধরনের বৈষম্য ও অন্যায়ের চর্চা না করার নির্দেশ দেন তিনি।
পুলিশের পোশাক ও অর্পিত দায়িত্বকে কেবল চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জনগণের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মহান অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আধুনিক প্রযুক্তিতে অপরাধ দমলের ওপর গুরুত্ব
প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলাকে পুলিশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসব জটিল অপরাধ দমনে প্রথাগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক তদন্ত, তথ্য বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল ফরেনসিকের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্ব্যবহার, পক্ষপাতিত্ব ও পেশিশক্তির পরিবর্তে পেশাদারত্ব, দক্ষতা এবং মানবিক পুলিশিং চর্চার ওপর জোর দেন তিনি।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কাজের সুযোগ
নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ পুলিশের বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটে কাজের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। তবে দায়িত্বে অবহেলা, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধানও কার্যকর থাকবে।
প্রশিক্ষণ শেষ করে কর্মজীবনে ২৪৬ নবীন কর্মকর্তা
প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্টের ৮৪ জন এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ)-এর ১৬২ জনসহ মোট ২৪৬ জন প্রশিক্ষণার্থী বাস্তব কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যারেড পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। এএসপি প্রবেশনার মো. মাহবুব হোসেন প্যারেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার পেলেন যাঁরা
২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্টদের মধ্যে বেস্ট সার্জেন্ট হয়েছেন ওমর ফারুক, বেস্ট একাডেমিক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ সাইফুল ইসলাম এবং বেস্ট শ্যুটার হয়েছেন আসাদুজ্জামান।
অন্যদিকে, ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ) থেকে বেস্ট ক্যাডেট হয়েছেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, বেস্ট একাডেমিক মো. বোরহানুল ইসলাম, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ দেওয়ান গোলাম রসুল এবং বেস্ট শ্যুটার হয়েছেন মো. কামাল গনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল মো. মাইনুল হাসান, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্বে থাকা মো. রেজাউল আলম সরকার এবং রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ।
এ ছাড়া সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত অতিথি, প্রশিক্ষণার্থীদের অভিভাবক এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

