শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসছেন প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু, গত সপ্তাহের দাঙ্গার পর কারফিউ ও জনসমাবেশে বিধিনিষেধ
ফ্রান্সে সাম্প্রতিক দাঙ্গার পর নতুন করে বিক্ষোভের প্রস্তুতির মধ্যে নিরাপত্তা জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। আগামী শনিবারের বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বিক্ষোভের নিরাপত্তা এবং প্রতিবাদ জানানোর মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উপায় নিয়ে বুধবার শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।
প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক
সংগঠনগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, বুধবার সকালে পাঁচটি শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন লেকর্নু। সেখানে বিক্ষোভের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, কিছু পক্ষ ‘অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডের’ মাধ্যমে বিক্ষোভকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী শনিবার আরও একটি বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে। ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচির আয়োজন করছে। এ ছাড়া শ্রমিক সংগঠনগুলো আগামী ৫ নভেম্বর আরেকটি বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। তবে বুধবারের বৈঠকে শিক্ষার্থীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
দাঙ্গার পর কারফিউ ও জনসমাবেশে নিষেধাজ্ঞা
গত সপ্তাহের শেষ দিকে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট এবং সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত এসব ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেয় কর্তৃপক্ষ।
ফরাসি কর্তৃপক্ষ সোমবার প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে আংশিক কারফিউ জারির ঘোষণা দেয়। পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে মঙ্গলবারও নতুন করে কারফিউ জারি করা হবে বলে জানিয়েছিলেন লেকর্নু।
মঙ্গলবার রাত ৯টা থেকে প্যারিসে রাতের কারফিউ কার্যকর হয়। এর আওতায় ছিল শহরের মধ্য-পূর্বাঞ্চলের রিপাবলিক স্কয়ার এবং কেন্দ্রস্থলের লে আল শপিং এলাকা। এ ছাড়া সরকারি ভবনের কাছাকাছি শঁজেলিজে সড়ক ও বিভিন্ন রেলস্টেশনে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।
গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভকারীদের সরকারি ভবন ও দোকানে আগুন দেওয়ার ঘটনার পর প্যারিস পুলিশ পেট্রল বা গ্যাসভর্তি ক্যান ও বোতল বহনের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞাও জারি করে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি স্বীকার
সংসদে ক্ষুব্ধ আইনপ্রণেতাদের মুখোমুখি হয়ে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু স্বীকার করেছেন, গত সপ্তাহের সহিংসতা মোকাবিলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। নতুন দফার বিক্ষোভের আগে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
লেকর্নু বলেন, ‘আগামী শনিবার বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হবে।’
এদিকে লিমুজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় অতি-বামপন্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। ভবনটি ধ্বংস হওয়ার ঘটনা দেশটিতে চলমান সহিংসতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা
ফ্রান্সে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ সেখানে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে।
ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে চলমান অস্থিরতা রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আগামী ছয় মাস পর দেশটির ভোটারদের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে এ অস্থিরতা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
নির্বাচনী রাজনীতিতে অস্থিরতার প্রভাব
কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মেরিন ল্য পেন চলমান অস্থিরতাকে ‘সতর্কসংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এ ঘটনা দেশটির গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় ভোটারদের পছন্দের তালিকায় ল্য পেন এগিয়ে রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, কট্টর বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসছেন।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু অভিযোগ করেছেন, কট্টর বামপন্থী উগ্র গোষ্ঠীগুলো এমন একটি ‘বিদ্রোহী পরিকল্পনা’ তৈরি করেছে, যার পরিণতিতে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।

