বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

আসামে উচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক, মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ, গৃহহীন ১১০০এর বেশি মুসলিম পরিবার, ভাঙা হয়েছে মসজিদ

তিন জেলায় ৬০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি দখলমুক্ত, মসজিদসহ হাজারো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ

ভারতের আসাম রাজ্যে বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযানে তিন জেলায় ৬০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। শনিবার ও রোববারের এ অভিযানে ১ হাজার ১০০-এর বেশি মুসলিম পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) ও রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজ্যের নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট জেলায় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে এ অভিযান চালানো হয়। প্রশাসনের দাবি, বনভূমি দখল করে এসব পরিবার বসতি গড়ে তুলেছিল। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দুই দিনে উচ্ছেদ ১১০০-এর বেশি পরিবার

স্ক্রলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার তিন জেলায় মোট ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। এর মধ্যে নগাঁও জেলায় ৩৩৬টি, গোলাঘাটে ৫৯টি এবং হোজাইয়ে ১৫২টি পরিবার রয়েছে।

রোববার নগাঁও জেলার লুটুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। বন বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্ক্রলকে জানান, ওই দিন ৬০০টির বেশি মুসলিম পরিবারের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার লুটুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রায় ৩১৪ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করা হয়। এ সময় ৫৬৩টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুনর্বাসনের দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের

লুটুমারির বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী আবদুল নূর বলেন, ১৯৭৪ সালে সরকার তাঁদের ওই এলাকায় পুনর্বাসন করেছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা মূলত কাছের জুরিয়া শহরের বাসিন্দা ছিলেন। পূর্বপুরুষেরা ভূমিহীন হওয়ায় সরকার তাঁদের সেখানে বসতি স্থাপনের সুযোগ দিয়েছিল।

আবদুল নূর বলেন, “সব মিলিয়ে ৩০০টি ভূমিহীন পরিবারকে চার বিঘা করে জমি দেওয়া হয়েছিল।”

তিনি আরও জানান, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তাঁরা গৌহাটি হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু আদালত থেকে কোনো প্রতিকার পাননি। তাঁর দাবি, উচ্ছেদ অভিযানে ৫০ বছরের বেশি পুরোনো কয়েকটি মসজিদসহ ১০টিরও বেশি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে।

নূর বলেন, তাঁরা বন বিভাগে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এ কারণেও অনেককে ওই এলাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল বলে তাঁর বক্তব্য।

মসজিদসহ ১ হাজার ৬৬৯টি স্থাপনা ভাঙার অভিযোগ

অল আসাম মাইনরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এএএমএসইউ) উচ্ছেদ অভিযানে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে।

সংগঠনটির দাবি, রোববারের অভিযানে পাঁচটি মসজিদসহ প্রায় ১ হাজার ৬৬৯টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

এএএমএসইউর সভাপতি এমডি ইমতিয়াজ হুসেইন বলেন, লুটুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদের মুখে পড়া ৫০০-এর বেশি পরিবারের মধ্যে প্রায় ৩০০টি পরিবারকে ১৯৭৩ সালে সরকার সেখানে পুনর্বাসন করেছিল। ওই পরিবারগুলোর মধ্যে ১৭৭টি ছিল মুসলিম পরিবার।

ইমতিয়াজ বলেন, “বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদের বিষয়ে ২০ জুলাইয়ের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। তবে আমরা বলতে চাই, রোববার ১৭৭টি মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, অথচ অমুসলিমদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদপ্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। তাদের এখনো কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি।”

আদালতের নির্দেশনার কথা বলছে প্রশাসন

বন বিভাগ আগস্টে মাইকিং করে উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, ঘোষণার পর প্রায় ৯০ শতাংশ দখলদার নিজেরাই এলাকা ছেড়ে চলে যান। আদালতের নির্দেশনা অনুসারেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেছে প্রশাসন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে ৩০০টি পরিবারকে অস্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। তবে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্যের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনের বৈষম্যের অভিযোগও সামনে এসেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন