বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

জ্বালানি সংকটে উত্তাল ইউরোপ, জনরোষে বাড়ছে উগ্র-ডানপন্থীদের জনপ্রিয়তা

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ফ্রান্স-ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ; নির্বাচনের আগে চাপে মূলধারার রাজনীতি

জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম, আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ে ইউরোপজুড়ে বাড়ছে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, স্পেন, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায় বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও কৃষকেরা ট্র্যাক্টর নিয়ে রাজপথে নেমেছেন, কোথাও সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এই অর্থনৈতিক সংকটের রাজনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে উগ্র-ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদী দলগুলো, যা আগামী নির্বাচনগুলোতে ইউরোপের মূলধারার রাজনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

ইতালির সিসিলি অঞ্চলের জিলা শহরে কৃষকদের ট্র্যাক্টর নিয়ে বিক্ষোভ এই অসন্তোষেরই একটি প্রতীকী চিত্র। ট্র্যাক্টরে ঐতিহ্যবাহী সিসিলিয়ান পতাকা উড়িয়ে রাজপথে জড়ো হওয়া কৃষকেরা জানিয়েছেন, জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয়ে কৃষিকাজ চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এক কৃষকের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমরা জমিতে ফসল ফলাই, আর ঘরে তুলি ঋণের বোঝা।’

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে আগে থেকেই চাপে থাকা সরকারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে ইউরোপের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো বা ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে এবং ডিজেলের দাম হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষক, পরিবহন খাতের কর্মী এবং ছোট ব্যবসায়ীরা ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

ফ্রান্সে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও লুটপাট

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অবকাঠামোসংক্রান্ত প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন স্থানে দোকানপাট লুটপাট, ভবনে অগ্নিসংযোগ এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। লিমোজেস শহরের উনিশ শতকের একটি ঐতিহাসিক সিটি হলও আগুনে পুড়ে গেছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নান্তেসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২১ বছর বয়সী তরুণ কেয়েন্তিন লেভিলু জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান ব্যয়ের চাপ তাঁর কাছে ভীতিকর মনে হচ্ছে। খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ন্যূনতম মজুরিতে চলা মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ ও তাঁদের যৌক্তিক দাবির কথা স্বীকার করেছেন। তবে একই সঙ্গে ধ্বংসযজ্ঞ, ভাঙচুর ও লুটপাটের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষের দাবি এবং সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িতদের এক করে দেখা উচিত নয়।

ইতালিতে কৃষক ও শ্রমজীবীদের ক্ষোভ

ইতালির মিলানে নাগরিক সেবার মান ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় পাথর নিক্ষেপ ও দোকানপাট লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।

অন্যদিকে, সিসিলির জিলা শহরে কৃষকেরা জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে কৃষি উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। কৃষি প্রতিনিধি আর্কানজেলো গ্যাম্বিনোর ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে ট্রাকচালক, খামারকর্মী ও ইস্পাতশ্রমিকদের সড়ক অবরোধের ফলে পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। এতে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সুপারমার্কেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

পর্তুগাল ও স্পেনে আবাসন সংকট নিয়ে ক্ষোভ

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে নিম্ন মজুরি, আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাজারো মানুষ রাজপথে নেমেছেন। এই বিক্ষোভ দেশটির মধ্য-ডানপন্থী সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

স্পেনেও আবাসন সংকট নিয়ে বড় ধরনের জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ৮৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা আবাসনের ব্যয় ও বাসস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবাসন সংকট দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

এ ছাড়া বেলজিয়ামে জীবনযাত্রার মান নিয়ে বিক্ষোভ এবং আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দুর্নীতি, বেকারত্ব ও শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার বিরুদ্ধে সমাবেশ হয়েছে। এসব ঘটনা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের বিস্তৃতি তুলে ধরছে।

অর্থনৈতিক সংকটে চাঙা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি

ফ্রান্সের রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সায়েন্সেস পো-এর রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জিল ইভালদির মতে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ইউরোপে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ।

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা কমলে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিগুলো সমর্থন বাড়ানোর সুযোগ পায়। গ্রামীণ এলাকার গাড়িচালক থেকে শুরু করে তরুণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষও এ প্রবণতাকে শক্তিশালী করছে।

এই পরিস্থিতিতে উগ্র-ডানপন্থী ও কট্টর বামপন্থী রাজনীতিকদের কেউ কেউ রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সম্পর্ক পুনরায় জোরদার করার পক্ষে মত দিচ্ছেন। তাঁদের যুক্তি, এতে জ্বালানি ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপের সম্ভাব্য প্রভাব ও বাস্তবায়ন নিয়ে ইউরোপের জ্বালানি নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ফ্রান্সে মারিন ল্য পেনের নির্বাচনী কৌশলে জ্বালানি

ফ্রান্সে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালির নেত্রী মারিন ল্য পেন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে রাজনৈতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান বিষয় করেছেন। জ্বালানির ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কমানোর প্রস্তাব দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের ব্যয়ের চাপ লাঘবের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল অঞ্চলের যেসব মানুষের কর্মস্থলে যাতায়াত ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়, তাঁদের কাছে জ্বালানির দাম অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ফলে জ্বালানির ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি ওই ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংঘাতের পর প্রেসিডেন্ট মাখোঁর জনপ্রিয়তা কমার বিপরীতে ল্য পেনের সমর্থন বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন তিনি।

নির্বাচনের আগে ইউরোপের সরকারগুলোর কঠিন পরীক্ষা

জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ব্যয় ও কর্মসংস্থান নিয়ে অসন্তোষ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আগামী নির্বাচনগুলোতে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

একই সঙ্গে উগ্র-ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি ইউরোপের রাজনৈতিক ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনৈতিক চাপ কমানো, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারগুলো কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে এই রাজনৈতিক প্রবণতার ভবিষ্যৎ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন