বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সজুড়ে দাঙ্গা, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ

জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভে আড়াই হাজারের বেশি গ্রেপ্তার, আহত প্রায় ১ হাজার পুলিশ সদস্য

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে চলমান বিক্ষোভ ও দাঙ্গার পর রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রীয় অংশসহ বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। সপ্তাহান্তে দেশটির বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আল শপিং এলাকায় কারফিউ কার্যকর থাকবে। সপ্তাহান্তে এসব এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়েছিলেন। এ ছাড়া রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশের কয়েকটি এলাকায় অনুমতি ছাড়া সমাবেশ আয়োজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলের মার্সেই, বোর্দো, নিস ও লিওঁ এবং উত্তরের লিলসহ আরও কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছে। শহরভেদে তরুণদের চলাচল ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার সংকট নিয়ে বৈঠকের পর জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী কারফিউ জারির ক্ষমতা স্থানীয় মেয়রদের দেওয়া হচ্ছে। তবে কোন কোন শহরে এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি।

দেশে জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনাও নাকচ করেননি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে সরকার অর্থ বরাদ্দ দেবে। পরে সহিংসতার জন্য দায়ীদের কাছ থেকে সেই অর্থ আদায় করা হবে।

লেকর্নু বলেন, “সম্পত্তির ক্ষতিসাধনকারীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে একটি আইন করা হবে।”

দাঙ্গা ও লুটপাটের কারণে যাঁরা কাজে যেতে পারেননি, তাঁদের সহায়তায় আংশিক বেকারত্ব তহবিল গঠনের কথাও জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান মাখোঁর

সহিংসতা মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে বিরোধী রাজনীতিবিদদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ। তিনি স্বীকার করেছেন, কয়েকটি শহরে পুলিশ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল।

রোববার পদত্যাগের চেষ্টা করেছিলেন নুনেজ। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তাঁর পদত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি বলে জানিয়েছে প্রেসিডেন্টের দপ্তর এলিসি প্রাসাদ।

দপ্তরটির বিবৃতিতে বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি আগাম আঁচ করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার বিষয়ে মাখোঁ যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে নুনেজকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।

এদিকে দাঙ্গার সম্ভাব্য উসকানিদাতাদের শনাক্ত করতে ২০০ তদন্তকারী সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্কুলের দাবিতে শুরু, পরে ছড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ

গত মাসে উন্নত স্কুলব্যবস্থার দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরকারি সেবার অবনতিসহ নানা বিষয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে। সপ্তাহান্তের বিক্ষোভে শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিবাদী গোষ্ঠী যোগ দিলে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।

কর্মকর্তাদের হিসাবে, সপ্তাহান্তে ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। প্যারিস, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহর ও ছোট জনপদে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা দাঙ্গাকারীদের গাড়ি ও ভবনে আগুন দিতে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালাতে দেখা যায়।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের ব্যবহৃত একটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

ঐতিহাসিক টাউন হল পুড়ে ছাই, ক্ষতিগ্রস্ত দুই হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান

মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে শনিবার দাঙ্গাকারীদের দেওয়া আগুনে ১৯ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক টাউন হলটি পুড়ে যায়। আগুন ছড়িয়ে পড়ার একপর্যায়ে ভবনটির ঘড়ির টাওয়ার ও ছাদ ধসে পড়ে।

ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিআই) প্রধান জানিয়েছেন, সপ্তাহান্তের সহিংসতায় দুই হাজারের বেশি দোকান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংগঠনটির প্রধান আলাঁ দি ক্রেসেনজো ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএলকে বলেন, দাঙ্গায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সিসিআইয়ের মার্সেই শাখার সভাপতি জ্যঁ-লুক শোভাঁ বিবিসিকে বলেন, শহরটির অনেক দোকানমালিক গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়েও তাঁরা শঙ্কিত।

লুট হওয়া পণ্য বিক্রি ঠেকাতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নজরদারি

ফ্রান্সের দুই মন্ত্রী জানিয়েছেন, দাঙ্গার সময় লুট হওয়া কিছু পণ্য অনলাইন বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে। অনলাইন মার্কেটপ্লেস ভিন্টেডের এক মুখপাত্র বলেছেন, চুরি করা পণ্য বিক্রি করা বা বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া তাদের প্ল্যাটফর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

তিনি বলেন, “এই সপ্তাহান্ত থেকে আমাদের দল লুটপাটের সঙ্গে সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন শনাক্ত ও সরিয়ে ফেলতে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। সন্দেহজনক বিজ্ঞাপনের ওপর নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।”

বিক্ষোভে রাজনৈতিক বিরোধও তীব্র

ফ্রান্সের বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের বিরুদ্ধে সহিংসতায় ভূমিকা রাখার অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন রাজনীতিবিদ। এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু অভিযোগ করেন, কিছু গোষ্ঠী “প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত আমাদের দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়”।

আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাওয়া দলটির নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এ অভিযোগের জবাবে বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে হয় অভিযোগের প্রমাণ দিতে হবে, নয়তো “ক্ষমা চাইতে হবে, চুপ থাকতে হবে এবং বিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়া বন্ধ করতে হবে”।

বিক্ষোভের জেরে একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকাগুলোর পুনরুদ্ধার এবং সহিংসতার দায় নির্ধারণ নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন