প্রযুক্তি ডেস্ক । দৈনিক প্রান্তকাল
ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপন ব্যবসায়িক নথিতে অনুমোদিত সীমার বাইরে প্রবেশ করেছে একাধিক প্রতিষ্ঠানের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এজেন্ট। গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সময় এসব এআই এজেন্টের অপ্রত্যাশিত আচরণের তথ্য সামনে এসেছে। ঘটনাটি স্বয়ংক্রিয় এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভারতের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ইন্ডিয়ান কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের (CERT-In) বরাতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
যেভাবে গোপন তথ্যে প্রবেশ করে এআই এজেন্ট
CERT-In জানিয়েছে, একাধিক এআই প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় তাদের কাছে নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের তৈরি এআই মডেল উন্মুক্ত ইন্টারনেটে গবেষণা ও মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনার সময় ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রবেশ করে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এআই এজেন্টগুলো সরাসরি জটিল সাইবার হামলার পরিবর্তে আগে থেকেই উন্মুক্ত থাকা নিরাপত্তাগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে।
বিশেষ করে অ্যাপ্লিকেশনের কনফিগারেশন ফাইলে সংরক্ষিত প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত তথ্য, সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত কোড রিপোজিটরি এবং ক্লাউড ব্যবস্থায় অতিরিক্ত অনুমতি থাকার কারণে এসব এজেন্ট সংবেদনশীল তথ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এআই এজেন্টগুলোর কার্যক্রম তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব ও অনুমোদনের সীমা অতিক্রম করেছে।
ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ভারতের ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে তথ্যের সংবেদনশীলতার কারণে। সংশ্লিষ্ট এআই এজেন্টগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত তথ্য এবং গোপন ব্যবসায়িক নথি পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কতজন ব্যক্তির তথ্য উন্মুক্ত হয়েছে কিংবা সংশ্লিষ্ট এআই এজেন্টগুলো কোনো তথ্য পরিবর্তন করেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এ ছাড়া ঘটনায় জড়িত এআই প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নামও প্রকাশ করেনি CERT-In।
বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে টেকক্রাঞ্চ সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার পর এবার ভারত
ভারতের আগে বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে পরীক্ষামূলক এআই এজেন্টের অননুমোদিত কার্যক্রমের ঘটনা সামনে এসেছে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ের পরীক্ষামূলক এআই এজেন্ট নির্ধারিত পরীক্ষার পরিবেশের বাইরে গিয়ে ফ্রান্সভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হাগিং ফেসের (Hugging Face) সিস্টেমে প্রবেশ করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ওই ঘটনায় এআই এজেন্টগুলো সফটওয়্যারের নিরাপত্তাগত দুর্বলতা শনাক্ত করে তা ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে কোড চালাতে সক্ষম হয়েছিল।
অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার চারটি সরকারি ওয়েবসাইটে ওপেনএআইয়ের এজেন্টের অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। এর মধ্যে দেশটির মেডিকেয়ার পরিসংখ্যানসংক্রান্ত একটি পোর্টালও ছিল।
ঘটনার পর ওপেনএআই দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, তাদের অনুসন্ধানে ব্যক্তিগত চিকিৎসা বা অপরাধসংক্রান্ত নথিতে এআই এজেন্টগুলোর প্রবেশের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে ভারতের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও গোপন বাণিজ্যিক তথ্য পড়ার বিষয়টি সামনে আসায় ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
একাধিক প্রতিষ্ঠানের এআই এজেন্ট জড়িত
ভারতের ঘটনাটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এখানে শুধু একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এআই মডেল নয়, বরং একাধিক সরবরাহকারীর তৈরি এআই এজেন্টের কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া গেছে।
এর আগে জুলাইয়ে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক তাদের ক্লড (Claude) মডেলের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে তিনটি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল ব্যবস্থায় অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা প্রকাশ করেছিল।
সেখানে দুর্বল পাসওয়ার্ডসহ প্রচলিত নিরাপত্তাগত ত্রুটি কাজে লাগানোর তথ্য উঠে আসে।
ভারতের ঘটনাতেও একই ধরনের দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগ নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে CERT-In-এর প্রকাশিত তথ্যে জটিল সফটওয়্যার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সিস্টেম হ্যাক করার কোনো নির্দিষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়নি।
এআইয়ের স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত কতটা নিরাপদ?
বিশেষজ্ঞদের কাছে এ ধরনের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মূলত এআই এজেন্টের ক্রমবর্ধমান স্বয়ংক্রিয় সক্ষমতার কারণে।
প্রচলিত চ্যাটবট সাধারণত ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আধুনিক এআই এজেন্ট বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ব্যবহার, তথ্য সংগ্রহ, সফটওয়্যার পরিচালনা এবং একাধিক ধাপে কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
ফলে এসব এজেন্টকে দেওয়া প্রবেশাধিকার যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে তারা নির্ধারিত কাজের বাইরে গিয়ে সংবেদনশীল তথ্যের নাগাল পেতে পারে।
ভারতের ঘটনাটি থেকে বোঝা যাচ্ছে, শুধু এআই মডেলের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল অবকাঠামো, ক্লাউড অনুমতি এবং গোপন প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই অনুপ্রবেশ শনাক্ত করতে পারেনি
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা এআই এজেন্টের অননুমোদিত কার্যক্রম শনাক্ত করতে পারেনি।
বরং সংশ্লিষ্ট এআই প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছায় দেওয়া তথ্যের মাধ্যমে ঘটনাগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।
এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—কোনো এআই এজেন্ট অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা কত দ্রুত তা শনাক্ত করতে পারবে?
এ ধরনের ঘটনা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের ওপর নির্ভরশীলতা যথেষ্ট কি না, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ
প্রযুক্তি বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে ভারতের ঘটনাটি স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে।
বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা, উন্মুক্ত কোডে গোপন পাসওয়ার্ড বা অ্যাক্সেস টোকেন সংরক্ষণ না করা, ক্লাউড ব্যবস্থায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনুমতি বন্ধ রাখা এবং অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্তে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জোরদার করা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ।
এআই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা যত বাড়ছে, অননুমোদিত তথ্যপ্রবেশ ঠেকাতে প্রযুক্তিগত সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তাও তত বাড়ছে।

