বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

ইতিহাসের বৃহত্তম একীভূকরণের পথে স্পেসএক্স ও টেসলা?

বিশেষ কমিটি গঠন, বাস্তবায়িত হলে হতে পারে ইতিহাসের বৃহত্তম বাণিজ্যিক একীভূকরণ

ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্স ও টেসলা ইনকরপোরেটেডকে একীভূত করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক একীভূকরণের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

মঙ্গলবার স্পেসএক্সের আয় বিবরণী প্রকাশের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারের সময় দুই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক বলেন, প্রতিষ্ঠান দুটিকে একীভূত করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। তাঁর মতে, অতি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সফটওয়্যার তৈরিতে দুই প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সহযোগিতা থেকে উল্লেখযোগ্য সুফল পাওয়া সম্ভব।

মাস্ক জানান, স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কায় একীভূতকরণ নিয়ে গঠিত কমিটিগুলোর আলোচনায় তিনি অংশ নিচ্ছেন না। কমিটিগুলো এখনো একীভূতকরণের শর্ত নিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বলেও জানান তিনি।

এক ছাতার নিচে আসতে পারে গাড়ি, রকেট ও ইন্টারনেট ব্যবসা

স্পেসএক্স ও টেসলা একীভূত হলে বৈদ্যুতিক গাড়ি, জ্বালানি ও রোবট তৈরির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হবে রকেট উৎক্ষেপণ এবং কৃত্রিম উপগ্রহনির্ভর ইন্টারনেট কার্যক্রম। এতে প্রযুক্তি, পরিবহন, জ্বালানি ও মহাকাশ খাতে দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরও সমন্বিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সম্ভাব্য একীভূকরণের অন্যতম ভিত্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটির অভিন্ন উচ্চাকাঙ্ক্ষা। প্রযুক্তি খাতের কেউ কেউ এখন এআইয়ের আরও উন্নত রূপকে ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ বা অতি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হিসেবে অভিহিত করছেন। এই প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ, চালকবিহীন গাড়ি এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ছে।

দুই প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্য সাড়ে তিন লাখ কোটি ডলার

স্পেসএক্স ও টেসলা—দুটি প্রতিষ্ঠানই নিজ নিজ শিল্প খাতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং বিশ্বের বৃহত্তম কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম। স্পেসএক্সের আনুষ্ঠানিক নাম স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজিস করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ কোটি মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, টেসলার বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার।

এই হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটির সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ফলে একীভূকরণ সম্পন্ন হলে এর ব্যাপ্তি ও আর্থিক গুরুত্ব হবে নজিরবিহীন।

ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল প্রকাশের পর বাজার বন্ধ হওয়ার পরবর্তী লেনদেনে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে টেসলার শেয়ারের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ।

আগে থেকেই রয়েছে ব্যবসায়িক সম্পর্ক

স্পেসএক্স ও টেসলার মধ্যে আগে থেকেই বেশ কিছু ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও অনেকে অভিন্ন। এমনকি কিছু কর্মীও উভয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত।

রকেট নির্মাতা স্পেসএক্স ১০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের টেসলা সাইবারট্রাক কিনেছে। অন্যদিকে, মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এক্সএআই টেসলার বৃহৎ পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সংরক্ষণে ব্যবহৃত ব্যাটারির অন্যতম প্রধান ক্রেতা।

এই বিদ্যমান সম্পর্ক সম্ভাব্য একীভূকরণের ক্ষেত্রে দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে একীভূকরণ হলে কোন প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হবে এবং এর শর্ত কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

শেয়ারবাজারে প্রবেশের পর বাড়ে আলোচনা

চলতি বছর বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহের মধ্যে স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে প্রবেশের পর টেসলার সঙ্গে একীভূকরণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়। শেয়ারবাজারে প্রবেশের মাধ্যমে স্পেসএক্স রেকর্ড পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে। এর ফলে টেসলাকে একীভূত করার মতো বড় উদ্যোগ নেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য প্রতিষ্ঠানটির তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে শেয়ারধারীদের কাছ থেকেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পরোক্ষ সম্মতি পাওয়া গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ব্লুমবার্গ নিউজ জানুয়ারিতে জানিয়েছিল, টেসলার সঙ্গে একীভূকরণের সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিল স্পেসএক্স। তবে শেষ পর্যন্ত মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক নতুন প্রতিষ্ঠান এক্সএআইকে অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় স্পেসএক্স।

একীভূকরণ নিশ্চিত নয়, প্রয়োজন শেয়ারধারীদের অনুমোদন

মাস্ক সতর্ক করে বলেছেন, স্পেসএক্স ও টেসলার একীভূকরণ নিশ্চিত নয়। এ জন্য শেয়ারধারীদের সমর্থন প্রয়োজন হবে। টেসলার ক্ষেত্রে শুধু ভোট দেওয়া শেয়ারধারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পেলেই চলবে না; বরং প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারধারীদের অন্তত ৫০ শতাংশের অনুমোদন নিতে হবে।

মাস্ক বলেন, অনেকে ধরে নিচ্ছেন স্পেসএক্স ও টেসলার একীভূকরণ নিশ্চিতভাবেই ঘটবে। তবে তাঁর মতে, এখনই এমন সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়া বাড়াবাড়ি হবে।

ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য একীভূকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও এর চূড়ান্ত রূপ নির্ভর করছে কমিটিগুলোর আলোচনা, একীভূকরণের শর্ত নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় শেয়ারধারীদের অনুমোদনের ওপর।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন