অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

বন্ধ কারখানা চালুর ঋণে গতি, অর্থ পায়নি বিজিএমইএর প্রত্যয়ন পাওয়া ২০০ কারখানা

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মসূচিতে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৬০ কোটি টাকা বিতরণ, ৯২৯ কোটি টাকার ঋণ প্রক্রিয়াধীন; ১৫টি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নে বড় বৈষম্য

বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে ঋণ বিতরণে কিছুটা গতি এসেছে। গত ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ কর্মসূচির আওতায় ৫৬০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে জমা পড়া ঋণ আবেদনের বড় অংশ এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অন্যদিকে, কর্মসূচির শর্ত পূরণ করেছে বলে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রত্যয়ন পাওয়া প্রায় ২০০টি পোশাক কারখানার একটিও এখন পর্যন্ত ঋণ পায়নি বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ঘোষিত কর্মসূচিতে ব্যাংকগুলো মোট ১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ৫৬০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ৯২৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া চলছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ কর্মসূচির আওতায় ৮০০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা পড়েছিল। এর বিপরীতে আটটি প্রতিষ্ঠানকে ১১০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। পরবর্তী ১৮ দিনে বিতরণের পরিমাণ বেড়ে ৫৬০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

ঋণ পায়নি বিজিএমইএর প্রত্যয়ন পাওয়া কারখানাগুলো

ঋণ বিতরণে অগ্রগতি হলেও পোশাক খাতের কারখানাগুলোর অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বিজিএমইএ জানিয়েছে, কর্মসূচির শর্ত পূরণ করেছে বলে সংগঠনটির প্রত্যয়ন পাওয়া প্রায় ২০০টি পোশাক কারখানার কোনোটি এখনো ঋণ পায়নি।

বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, “আমাদের জানামতে, এ কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত একটি পোশাক কারখানাও ঋণের অর্থ পায়নি।”

এ ছাড়া চারটি কারখানার মালিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানিয়েছেন, তাঁরাও এখনো ঋণের অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।

১৫টি কর্মসূচিতে বিতরণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ১৫টি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় ১৪ হাজার ৫১৯ কোটি টাকার ঋণ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

মোট বরাদ্দের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়নের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুনে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য এ কর্মসূচি ঘোষণা করে। তবে ঋণের আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যাংকগুলোর অক্টোবর পর্যন্ত সময় লেগেছে।

ঋণের ঝুঁকি বাণিজ্যিক ব্যাংকের, সিদ্ধান্তেও সতর্কতা

বাংলাদেশ ব্যাংক তুলনামূলক কম সুদে তহবিল সরবরাহ করলেও ঋণের পুরো ঝুঁকি বহন করতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে টিকে থাকতে পারবে কি না, তা মূল্যায়নের দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের।

এ ব্যবস্থায় ঋণপ্রত্যাশী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথমে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন করে। ব্যাংকগুলো আবেদন যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেওয়ার পর অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়।

ঋণের ঝুঁকি পুরোপুরি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর থাকায় বিতরণে ধীরগতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে বিদ্যমান তথ্য থেকে বিলম্বের সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বৃহত্তর পুনঃঅর্থায়ন প্যাকেজটি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছিলেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

কিছু কর্মসূচিতে বরাদ্দের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। রপ্তানিপূর্ব ঋণ ও কুটির-মাইক্রো উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে তুলনামূলক বেশি ঋণ বিতরণ হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও পল্লি উন্নয়নসংক্রান্ত কয়েকটি কর্মসূচিতে অগ্রগতি খুবই কম বা একেবারেই নেই।

সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে। এ কর্মসূচিতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যা বরাদ্দের চেয়ে ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি।

কুটির ও মাইক্রো খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচিতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে। অর্থাৎ, এ কর্মসূচির বাস্তবায়নের হার ৫০ শতাংশ।

সিএমএসএমই খাতের চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ৯০৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে, সৃজনশীল অর্থনীতি কর্মসূচিতে বরাদ্দের পুরো ৫০০ কোটি টাকাই বিতরণ করা হয়েছে।

বিদেশে কর্মসংস্থান অর্থায়ন কর্মসূচিতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থায়নে অগ্রগতি কম

কৃষি ও গ্রামীণ খাদ্যনিরাপত্তা পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ঋণ বিতরণ হয়েছে মাত্র ২৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের হার ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র কর্মসূচিতে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ঋণ বিতরণ হয়েছে মাত্র ৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

স্টার্টআপ খাতে অর্থায়ন কর্মসূচিতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ৩২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া আরও ৫ কোটি টাকার ঋণ আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বেকার যুবকদের কর্মসূচিতে এখনো ঋণ বিতরণ হয়নি

বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান অর্থায়ন কর্মসূচিতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পুরো অর্থই বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ কর্মসূচির আওতায় কোনো ঋণ বিতরণ করা হয়নি।

পরিবেশবান্ধব কারখানা ভবন ও সবুজ শিল্প পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৫২৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকার ঋণ আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একইভাবে, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি খাতের জন্য নির্ধারিত ২ হাজার কোটি টাকার কর্মসূচিতে ৯৮ কোটি টাকার ঋণ আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তবে এ দুটি কর্মসূচির কোনোটিতেই এখন পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হয়নি।

তিন কর্মসূচিতে আবেদন নেই, বিতরণও শূন্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের তিনটি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি। এমনকি এসব কর্মসূচির আওতায় কোনো ঋণ আবেদনও প্রক্রিয়াধীন নেই।

কর্মসূচিগুলো হলো—রপ্তানি বহুমুখীকরণ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীলকরণ কর্মসূচি এবং হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানি খাতের পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি।

এ তিন কর্মসূচিতে মোট ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে ১ হাজার কোটি টাকা এবং হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিগুলোর আওতায় উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ঋণ বিতরণ হলেও কয়েকটি খাতে অর্থায়ন এখনো শুরু হয়নি বা খুব সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগে ঋণ বিতরণের গতি বাড়লেও পোশাক কারখানাগুলোর অর্থপ্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা কর্মসূচিটির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন