অনুসরণ করুন:
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণ ব্যবসায় নতুন নীতিমালা, লাইসেন্স ও লেনদেনে কঠোর শর্ত

মানি চেঞ্জারে ডলার বিক্রি ও নগদ স্থিতির সীমা নির্ধারণ; স্বর্ণ আমদানিতে প্রতি চালানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক

বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসা, মানি চেঞ্জার কার্যক্রম, স্বর্ণ আমদানি ও পরিশোধন খাতের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন, লেনদেনের সীমা এবং তদারকিসংক্রান্ত নীতিমালা সমন্বয় ও হালনাগাদ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে পাঁচ শ্রেণির নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও কার্যক্রম পরিচালনার শর্ত একত্র করে সমন্বিত সার্কুলার জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নতুন নির্দেশনায় অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংক, পূর্ণাঙ্গ ও সীমিত মানি চেঞ্জার, অনুমোদিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী এবং স্বর্ণ আকরিক ও ডোরে আমদানির অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের সীমা, নগদ অর্থের স্থিতি, লাইসেন্সের মেয়াদ ও নবায়ন, প্রতিবেদন দাখিল এবং অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধসংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর ২০(৩) ধারার অধীনে জারি করা সার্কুলারটি জারির তারিখ থেকে এক বছর কার্যকর থাকবে। এতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোতে আগের নির্দেশনাগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

ভ্রমণসুবিধায় ডলার সরবরাহের সীমা

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো প্রযোজ্য ভ্রমণসুবিধার বিপরীতে একজন ব্যক্তিকে প্রতি যাত্রায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার নোট ও কয়েন সরবরাহ করতে পারবে। নির্দিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রেও একই সীমা প্রযোজ্য হবে।

নগদে সরবরাহের নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত অবশিষ্ট ভ্রমণসুবিধা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রায় অথবা আন্তর্জাতিক ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া যাবে।

অন্যদিকে, পূর্ণাঙ্গ মানি চেঞ্জারগুলো বাংলাদেশি নাগরিকদের বার্ষিক ব্যক্তিগত ভ্রমণসুবিধার বিপরীতে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার নোট বিক্রি করতে পারবে।

মানি চেঞ্জারে ফি ও লেনদেনের রেকর্ড বাধ্যতামূলক

যাত্রীর পাসপোর্টে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির তথ্য এন্ডোর্সমেন্ট করার জন্য পূর্ণাঙ্গ মানি চেঞ্জারগুলো সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা ফি নিতে পারবে। এ ফি প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি অর্থ পরিশোধের বিপরীতে গ্রাহককে রসিদ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিদেশি পর্যটকেরা সিস্টেমে তৈরি এনক্যাশমেন্ট সনদ দেখিয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারের মাধ্যমে অব্যবহৃত বাংলাদেশি টাকা সর্বোচ্চ ৫০০ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করতে পারবেন।

সার্কুলারে পূর্ণাঙ্গ মানি চেঞ্জারগুলোর প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন মানি চেঞ্জার মনিটরিং সিস্টেমে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে গ্রাহককে স্বতন্ত্র লেনদেন শনাক্তকরণ নম্বরসংবলিত সিস্টেম-উৎপাদিত স্বীকৃতিপত্র দিতে হবে।

এ ছাড়া প্রতি মাসের লেনদেন বিবরণী পরবর্তী মাসের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে।

নগদ স্থিতি ও আর্থিক সক্ষমতার শর্ত

পূর্ণাঙ্গ মানি চেঞ্জারগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ও বাংলাদেশি টাকার স্থিতির সীমাও নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, তাদের বৈদেশিক মুদ্রার দৈনিক সমাপনী নগদ স্থিতি সর্বোচ্চ ২৫ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ হতে পারবে। অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকে রক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবের স্থিতি সর্বোচ্চ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ এবং নগদ বাংলাদেশি টাকার স্থিতি সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ মানি চেঞ্জারের লাইসেন্সের মেয়াদ হবে এক বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত দুই মাস আগে নবায়নের আবেদন করতে হবে।

লাইসেন্স পাওয়ার জন্য বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ন্যূনতম পরিমাণ ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫ লাখ মার্কিন ডলার এবং অন্যান্য এলাকায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ হতে হবে।

একক মালিকানা ও অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম নিট সম্পদ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। আর যৌথ মূলধনী কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন হতে হবে কমপক্ষে ১ কোটি টাকা।

সীমিত মানি চেঞ্জার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক বিধান

সার্কুলারে ব্যাংকের শাখা বা বুথের মাধ্যমে পরিচালিত সীমিত মানি চেঞ্জার কার্যক্রম এবং হোটেল, উপহারের দোকানসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের জন্য পৃথক শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যাংকবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি পাসপোর্টধারীদের কাছে পণ্য ও সেবা বিক্রির বিপরীতে কেবল নগদ বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণ করতে পারবে। তবে তারা সাধারণ জনগণের কাছে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করতে পারবে না।

এসব প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী কার্যদিবসের মধ্যে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে সংগৃহীত বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করতে হবে। তবে পরিচালনাগত সুবিধার জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার মার্কিন ডলার সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ করা যাবে।

এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ হবে দুই বছর। তবে ব্যাংকের বুথের জন্য দেওয়া অনুমতির পর্যায়ক্রমিক নবায়নের প্রয়োজন হবে না।

সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাসিক প্রতিবেদন দাখিলের পাশাপাশি অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধসংক্রান্ত নির্দেশনাও বাধ্যতামূলকভাবে পরিপালন করতে হবে।

স্বর্ণ আমদানিতে প্রতি চালানে পৃথক অনুমোদন

নতুন নীতিমালায় অনুমোদিত স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের লাইসেন্সের আওতায় স্বর্ণবার ও স্বর্ণালংকার আমদানির শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে লাইসেন্স থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বর্ণ আমদানির অনুমতি পাওয়া যাবে না। প্রতিটি চালানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃথক পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

আবেদনে আমদানির চাহিদা এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনে ব্যবহৃত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ উল্লেখ করতে হবে।

স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের লাইসেন্সের মেয়াদ হবে দুই বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত তিন মাস আগে নবায়নের আবেদন করতে হবে। নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ টাকা।

স্বর্ণ পরিশোধন প্রতিষ্ঠানের অনুমতির মেয়াদ পাঁচ বছর

স্বর্ণ পরিশোধনের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ আকরিক ও ডোরে আমদানির অনুমতি পেতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে একাধিক শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, নিরাপদ সংরক্ষণব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা, উপযুক্ত তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং করসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পরিপালন।

যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক অনুমতি ফি ৩০ লাখ টাকা এবং নবায়ন ফি ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুমতির মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।

লাইসেন্স বাতিলসহ তদারকির ক্ষমতা বহাল

নতুন সার্কুলারে নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির ক্ষমতা বহাল রাখা হয়েছে। প্রযোজ্য আইন ও নির্দেশনা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং লাইসেন্স বা অনুমতি বাতিল করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কোনো ব্যাংক তার নির্দিষ্ট শাখায় বৈদেশিক মুদ্রা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি চাইলে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন, আগের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও বকেয়া আমদানি বিলের তথ্য, যোগ্য জনবলের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট শাখার অনুমোদনসংক্রান্ত নথি জমা দিতে হবে।

এ ছাড়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জার ও অন্যান্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাস্থল পরিবর্তন, মালিকানা হস্তান্তর এবং কোম্পানির কাঠামোগত পুনর্গঠনের পদ্ধতিও সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সমন্বিত নীতিমালার লক্ষ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণ ব্যবসার নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও সুসংহত করা। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানভেদে কার্যক্রম পরিচালনার শর্ত নির্দিষ্ট করে লাইসেন্স, লেনদেন, প্রতিবেদন দাখিল ও তদারকির ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা বজায় রাখা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন