জ্বালানি সরবরাহের সংকট মোকাবিলায় মাতারবাড়ীকে হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা; কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ৪১২ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহের সংকট মোকাবিলায় মাতারবাড়ীকে জ্বালানি হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার রাজধানীর উত্তরায় তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর কার্যালয়ে সংগঠনটির পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসনবিষয়ক (ইএসজি) প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে।”
কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্ব
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
দেশের তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা মানুষের মধ্যে নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগও বাড়ানো প্রয়োজন।
সামাজিক সুরক্ষায় নতুন কর্মসূচি
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড চালু এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিতুমীর। তাঁর মতে, এসব কর্মসূচি নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমাতে এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে ভূমিকা রাখবে।
প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে পার্থক্যের কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস সাধারণত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তুলনায় কম থাকে। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস থাকে মাঝামাঝি পর্যায়ে।
তবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতিপথ নির্ভর করবে সরকার কতটা কার্যকরভাবে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারে, তার ওপর বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের বিষয়ে তিতুমীর বলেন, প্রস্তুতির জন্য সময় বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা এগোচ্ছে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও জ্বালানি নিরাপত্তা
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা, অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পণ্য পরিবহনে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলাকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানান উপদেষ্টা।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ বাড়ানো এবং ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি কমাতে মাতারবাড়ীকে জ্বালানি হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ এবং বাংলাদেশে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার।

