অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

গ্যাস সংকট ও অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে লাগতে পারে দুই বছর: অর্থমন্ত্রী

জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় ৭০০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়, ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন ও ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সরকারের

বিদ্যমান গ্যাস সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে গেলেও আপাতত শিল্পখাতকে চাপের মধ্য দিয়েই যেতে হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) আয়োজনে ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন আশ্বাস দিয়ে জনগণকে ভুল প্রত্যাশা দেওয়া ঠিক হবে না। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দুই বছরের মধ্যে জ্বালানিসহ পুরো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনার চেষ্টা করা হবে। তৃতীয় বছরে অর্থনীতি গতি পাবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে গিয়ে অর্থনীতি পূর্ণমাত্রায় ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত ব্যয় ৭০০ কোটি ডলার

অর্থমন্ত্রী জানান, জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশকে ইতোমধ্যে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়েছে। বৈশ্বিক সংকট আরও তীব্র হওয়ায় এই ব্যয়ের পরিমাণ ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংকট দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে শিল্পমালিক ও উৎপাদকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে। তবে পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

৩ থেকে ৪টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা

গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকার একাধিক উদ্যোগ নিচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে তিন থেকে চারটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। এসব প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা অর্থায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

তবে এ ধরনের টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে অন্তত ১৮ মাস সময় প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালির অভিজ্ঞ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উপকূলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

বড় আকারের এলএনজি ও জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল সহজ করা এবং পরিবহন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে মাতারবাড়ী ও খুলনার কাছাকাছি পানির প্রায় ২০ মিটার গভীরতাসম্পন্ন আরেকটি অঞ্চলকে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হাব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

বাপেক্সের মাধ্যমে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্টের (পিএসসি) আওতায় স্থলভাগ ও সমুদ্রে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাপেক্সের মাধ্যমে ১৫০টি নতুন কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার প্রস্তাবও ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে বলে জানান তিনি।

৩ থেকে ৪ বছরে ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য

জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে সারাদেশে প্রায় ১০ গিগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাসাবাড়ির গ্রাহকেরা ছাদে উৎপাদিত অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে আকর্ষণীয় দামে বিক্রি করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

জুনের মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা চূড়ান্ত

অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী জুনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তী আড়াই বছরের মধ্যে প্রধান প্রধান জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করারও পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রমের ফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে ব্যবসায়ী সমাজকে আগামী কিছুদিন কঠিন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার ও রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার

সামগ্রিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আর্থিক খাতের দুর্বলতা, পুঁজিবাজারের অস্থিরতা এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কম রাজস্ব আদায়কে সরকারের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য সরকার কাজ করছে। রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে পৃথক করার পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সামগ্রিক কর প্রশাসনে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ অব্যাহত সমর্থন পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। তবে সংস্কার কার্যক্রম ও জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পের সুফল পেতে সময় লাগবে।

আলোচনায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা

অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক।

এ ছাড়া এফআইসিসিআইয়ের প্রতিনিধি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন