অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

মূল্যস্ফীতি কমার পরও কেন স্বস্তি ফিরছে না মানুষের সংসারে

দাম বাড়ার গতি কমেছে, কমেনি পণ্যের দাম; মজুরি প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা

প্রতি মাসে মূল্যস্ফীতির নতুন হিসাব প্রকাশিত হয়। কখনো সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার খবর আসে। কিন্তু বাজারে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয় সাধারণ মানুষকে। এখানেই সরকারি হিসাব ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার মধ্যে ফারাক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বাড়ার গতি কমে আসা। ফলে আগের উচ্চমূল্যে পণ্য কেনার যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা থেকে যাচ্ছে।

সরকারি হিসাবে, গত মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে। টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি কমা ইতিবাচক প্রবণতা হলেও গত বছরের আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ০৩ শতাংশ। পণ্যের দাম কমেনি, শুধু দাম বাড়ার গতি সামান্য কমেছে। তাই মূল্যস্ফীতি কমার খবর এলেও সাধারণ মানুষের সংসারে স্বস্তি ফেরার মতো পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়।

নিত্যপণ্যের বাইরেও বাড়ছে সংসারের ব্যয়

সংসারের ব্যয়ের চাপ শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে সীমাবদ্ধ নয়। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ বাড়লে পারিবারিক বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। খাদ্যপণ্যের দাম মৌসুমি সরবরাহের কারণে কখনো কিছুটা কমলেও বাড়িভাড়া কিংবা যাতায়াতের ব্যয় সহজে কমে না। ফলে বাজারে কোনো কোনো পণ্যের দামে সাময়িক স্বস্তি এলেও পরিবারের সামগ্রিক ব্যয় আগের মতোই থেকে যায়, অনেক ক্ষেত্রে আরও বাড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আয় ও মজুরি বৃদ্ধির ব্যবধান। গত আগস্টে মজুরি প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় বাড়ার হারও মূল্যবৃদ্ধির হারের চেয়ে কম। গত বছর ১০০ টাকার পণ্য কিনতে এ বছর ১০৮ টাকা ২৬ পয়সা লাগলে, আয় বেড়ে ১০৮ টাকা ৫ পয়সা হলেও আগের সমপরিমাণ পণ্য কেনা সম্ভব হবে না।

এক বছরে এ ব্যবধান সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু বছরের পর বছর আয় বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই কমে যায়। তখন সংসারের খরচ মেটাতে খাবার, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের পড়াশোনার ব্যয়ে কাটছাঁট করতে হয়। নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য এ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

শুধু চাহিদা নিয়ন্ত্রণে মূল্যস্ফীতি কমবে না

মূল্যস্ফীতির জন্য শুধু মানুষের বাড়তি চাহিদাকে দায়ী করা যায় না। জ্বালানি, আমদানি, পরিবহন ও উৎপাদন খরচও পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাজারে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা প্রতিযোগিতা কম থাকলে এসব চাপ আরও তীব্র হতে পারে। তাই সুদহার বাড়িয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সমস্যাগুলোও সমাধান করা জরুরি।

সরকার চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে একটি পূর্বাভাসে চলতি বছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। একই পূর্বাভাসে ভারতের মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশ, নেপালের ৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৮ দশমিক ৩ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যানের সময়কাল ও হিসাবের ভিত্তি যাচাই করা জরুরি। তবে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকার আশঙ্কা দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধানে আরও মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও বড় ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের বাজারে এ চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশ্ববাজারের ধাক্কা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে আমদানির উৎস বহুমুখী করা, বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে এর প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে দেশীয় বাজারে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা নজরদারিতে রাখা দরকার।

সুদহার ও বিনিয়োগে ভারসাম্য জরুরি

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সুদহার বেশি থাকলে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে এবং বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা কমতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ও বিনিয়োগের ব্যয়ও বেড়ে যায়। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এ কারণে শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা যথেষ্ট নয়। ঋণ কোন খাতে যাচ্ছে, উৎপাদন কতটা বাড়ছে এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ কেমন—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হলে সরবরাহ বাড়ানো কঠিন হবে, আর সরবরাহের ঘাটতি থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও সতর্কতা প্রয়োজন

সরকারের রাজস্ব ও ব্যয়ের চাপও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি দিলে বাজেটের ওপর চাপ পড়ে। আবার ভর্তুকি কমিয়ে দাম বাড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়লেও অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ একই হারে না বাড়লে অতিরিক্ত চাহিদা পণ্যের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বেতন বৃদ্ধি, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও বাজারে পণ্যের সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর বিষয়টিও নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

বাজারের সরবরাহব্যবস্থায় নজরদারি বাড়াতে হবে

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার বাজারের সরবরাহব্যবস্থায়। কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছাতে কত খরচ হচ্ছে, কোথায় অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে এবং পরিবহন ও সংরক্ষণে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। চাল, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ ও ডিমের বাজারে কারসাজি থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রয়োজনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি শুল্ক সাময়িকভাবে কমানো এবং দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে আমদানিতে দেওয়া সুবিধার সুফল যেন ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে কৃষককে ন্যায্য দাম দিতে হবে, যাতে ভোক্তার জন্য দাম কমানোর উদ্যোগ নিতে গিয়ে উৎপাদক লোকসানে না পড়েন। উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করেই কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করাও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য টিসিবির কার্যক্রম, খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি এবং সামাজিক সুরক্ষা ভাতা আরও কার্যকর করা দরকার। যাঁদের আয় বাজারদরের তুলনায় কম বাড়ছে, তাঁদের জন্য শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সরাসরি সহায়তাও প্রয়োজন।

লক্ষ্যমাত্রার পাশাপাশি বাস্তব অগ্রগতি জরুরি

আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, দেশীয় কৃষি উৎপাদন, আমদানি ব্যয় এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহের ওপর। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে মূল্যস্ফীতি আরও কমতে পারে। কিন্তু তেলের দাম বাড়লে কিংবা সরবরাহে বাধা তৈরি হলে এ অগ্রগতি থেমেও যেতে পারে।

তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মূল্যস্ফীতি একটি নির্দিষ্ট হারে নামবেই—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং সেসব পদক্ষেপের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা বেশি জরুরি। মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা বোঝার জন্য শুধু সামগ্রিক সূচক নয়, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার দামের পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি শুধু একটি অর্থনৈতিক সংখ্যা নয়। এর প্রভাব পড়ে মাসের বাজার, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচে। দাম বাড়ার গতি কমলেও মাসের শেষে মানুষের হাতে টাকা না থাকলে সেই স্বস্তির অর্থ সীমিত। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাফল্য বিচার করতে হলে পণ্যের দামের পাশাপাশি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তনও দেখতে হবে।

সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে কি না, তার উত্তর পরিসংখ্যানে পাওয়া যাবে। কিন্তু মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরেছে কি না, তার প্রকৃত উত্তর মিলবে মাসের খরচ মেটানোর পর হাতে কত টাকা থাকছে, সেই হিসাবেই।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন