বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

স্মার্ট টিভি-ফ্রিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে এআই, অ্যানথ্রপিকের সতর্কতা

ডেটা সেন্টার ছাড়াই এআইয়ের প্রতিলিপি তৈরির আশঙ্কা, সাইবার নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি দেখছেন গবেষকেরা

স্মার্ট টিভি, ফ্রিজ ও অন্যান্য ইন্টারনেট-সংযুক্ত গৃহস্থালি যন্ত্রের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের গবেষকেরা। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে ছোট এআই মডেলগুলো এমন সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যার ফলে কোনো কেন্দ্রীয় সার্ভার বা ডেটা সেন্টার ছাড়াই এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অ্যানথ্রপিকের গবেষকেরা জানান, বাসাবাড়ি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ব্যবহৃত ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ডিভাইসে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম এআই মডেল তৈরি হতে ‘মাত্র কয়েক মাস সময় লাগতে পারে’। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে তৈরি একাধিক এআই মডেল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ‘ফ্রন্টিয়ার রেড টিম’ এ গবেষণা চালায়।

গবেষকদের মতে, এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় এআই ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ ও বন্ধ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, কোনো একটি কেন্দ্রীয় সার্ভার বন্ধ করে দিলেই ছড়িয়ে পড়া সব প্রতিলিপির কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব নাও হতে পারে।

গৃহস্থালি যন্ত্র হতে পারে সাইবার হামলার লক্ষ্য

গবেষকেরা বলছেন, ক্ষতিকর এআই ওয়ার্মের জন্য ডেটা সেন্টারগুলো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হলেও স্মার্ট টিভি, রেফ্রিজারেটর, ওভেন ও স্বয়ংক্রিয় ঘাস কাটার যন্ত্রের মতো ইন্টারনেট-সংযুক্ত ডিভাইসও ভবিষ্যতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এসব যন্ত্রে ক্রমেই কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়ছে। একই সঙ্গে অনেক ডিভাইসে তুলনামূলক দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকায় সেগুলো সাইবার হামলার প্রবেশপথ হয়ে উঠতে পারে।

তবে গবেষণায় পরীক্ষিত কোনো স্মার্ট টিভিতে এখনো এআই মডেলের নির্ভরযোগ্য স্বয়ংক্রিয় প্রতিলিপি তৈরির সক্ষমতা সফলভাবে দেখানো যায়নি। গবেষকদের পূর্বাভাস, প্রযুক্তির বর্তমান অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এমন সক্ষমতাসম্পন্ন মডেলের আবির্ভাব ঘটতে পারে।

গবেষক উইলিয়াম ঝৌ ও ড্যানিয়েল ফ্রিম্যান বলেন, ইন্টারনেট-সংযুক্ত থাকা এবং তুলনামূলক দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে বাসাবাড়ি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার আইওটি ডিভাইসগুলো এ ধরনের আক্রমণের প্রথম লক্ষ্য হতে পারে।

তারা আরও সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে এমন অনেক স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট তৈরি হতে পারে, যেগুলো মানুষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে কাজ করবে।

এআই ওয়ার্ম নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

সাধারণ কম্পিউটার ওয়ার্ম নতুন কোনো ধারণা নয়। তবে এআই-চালিত ওয়ার্মের ক্ষেত্রে ঝুঁকির ধরন ভিন্ন হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব লুইভিলের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রোমান ভি ইয়ামপোলস্কি আল জাজিরাকে বলেন, সাধারণ কম্পিউটার ওয়ার্মের তুলনায় এআই ওয়ার্ম অপরিচিত ডিভাইস বিশ্লেষণ করতে, ব্যর্থ হলে কৌশল পরিবর্তন করতে এবং মানুষের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হতে পারে।

ইয়ামপোলস্কির মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি এখনই অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি না হলেও তা উদ্বেগের কারণ। স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরির ক্ষমতার সঙ্গে হ্যাকিং ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা যুক্ত হলে কোনো একক নিয়ন্ত্রণকারী দিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে থামানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এআই প্রযুক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা এবং অনুমোদনহীন সাইবার হামলার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অ্যানথ্রপিক ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা ধীর করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো প্রধান প্রযুক্তি শক্তিগুলো এ ধরনের আহ্বানে কতটা সাড়া দিচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি বাধ্যতামূলক নয়—এমন চুক্তিতে অংশ নেয়। তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

ডিস্টিলেশন অ্যাটাক ঠেকানোর দাবি অ্যানথ্রপিকের

এদিকে সোমবার পৃথক এক ঘোষণায় অ্যানথ্রপিক জানায়, ‘ডিস্টিলেশন অ্যাটাক’ প্রতিরোধে তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ ধরনের প্রক্রিয়ায় উন্নত এআই মডেল থেকে অনুমতি ছাড়া বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে তুলনামূলক কম সক্ষম ও কম খরচের মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

অ্যানথ্রপিকের অভিযোগ, চীনের ডিপসিক, মুনশট ও মিনিম্যাক্স তাদের ক্লড এআই মডেল থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য নিয়ে নিজেদের মডেল তৈরি করছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি।

অ্যানথ্রপিকের দাবি, অননুমোদিত তথ্য সংগ্রহ ঠেকাতে নেওয়া ব্যবস্থার ফলে তথ্য চুরির পরিমাণ ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশ কমেছে।

এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের অপব্যবহার এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। গবেষকদের সতর্কতা বলছে, ভবিষ্যতে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় গৃহস্থালি যন্ত্রসহ ইন্টারনেট-সংযুক্ত ডিভাইসের নিরাপত্তাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন