আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডকে যাত্রাবিরতির কেন্দ্র করে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছান নর্স অভিযাত্রীরা, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে মিলেছে প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য
ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বাহামা দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছান। ঘটনাটি ইউরোপীয়দের আমেরিকা অভিযানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। তবে বর্তমানে আমেরিকা নামে পরিচিত ভূখণ্ডে পৌঁছানো প্রথম ইউরোপীয় অভিযাত্রী ছিলেন না কলম্বাস। তার প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগেই উত্তর আটলান্টিকের দুর্গম জলপথ পাড়ি দিয়ে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন নর্স বা ভাইকিং অভিযাত্রীরা।
তাদের এই অভিযানের বিবরণ পাওয়া যায় প্রাচীন আইসল্যান্ডীয় নর্স সাগায়। এসব উপাখ্যানে গ্রিনল্যান্ড ও উত্তর আমেরিকায় নর্সদের যাত্রা, অনুসন্ধান এবং বসতি স্থাপনের প্রচেষ্টার কথা উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব কাহিনির ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা থাকলেও আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় উত্তর আমেরিকায় ভাইকিংদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ইতিহাসের মূল্যবান দলিল নর্স সাগা
চতুর্দশ শতকে সংকলিত ‘ফ্লাতেইয়ারবোক’ বা ‘ফ্লাতেই দ্বীপের বই’ নর্স ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপি। ১৯৬৬ সালে বিবিসির উপস্থাপক ম্যাগনাস ম্যাগনুসন এটিকে বিদ্যমান আইসল্যান্ডীয় পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে অন্যতম মূল্যবান বলে বর্ণনা করেন।
পাণ্ডুলিপিটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝাতে ম্যাগনুসন ১৮৯৩ সালের শিকাগো বিশ্বমেলার একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজকেরা ডেনমার্কে সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপিটি ধার চেয়েছিলেন। সেটি যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য যুদ্ধজাহাজ পাঠানো, দেশের অভ্যন্তরে পরিবহনে সাঁজোয়া ট্রেন ব্যবহার এবং পাণ্ডুলিপিটির নিরাপত্তায় ১০ লাখ ডলারের বিমা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান। তবে এত নিরাপত্তার ব্যবস্থা সত্ত্বেও ডেনমার্কের কর্তৃপক্ষ পাণ্ডুলিপিটি পাঠাতে রাজি হয়নি।
পাণ্ডুলিপিটিতে দশম শতকে গ্রিনল্যান্ডে নর্সদের বসতি স্থাপনের বিবরণের পাশাপাশি উত্তর আমেরিকায় তাদের অভিযাত্রা ও বসতি গড়ার প্রাথমিক প্রচেষ্টার কথাও রয়েছে। এসব বিবরণ ভাইকিংদের আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারে মিলেছে প্রমাণ
১৯৬০ সালে কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের ল’আঁস ও মেডোজ এলাকায় প্রাচীন নর্সদের একটি শিবিরের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে উন্নত কালনির্ধারণ পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষকেরা নিশ্চিত হন, প্রায় এক হাজার বছর আগে সেখানে নর্সদের উপস্থিতি ছিল।
গবেষকদের ধারণা, উত্তর আমেরিকার আরও গভীরে অনুসন্ধান চালানোর জন্য এলাকাটি অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এটি উত্তর আমেরিকায় ভাইকিংদের উপস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ।
১৯৯৭ সালে বিবিসির প্রামাণ্যচিত্র সিরিজ ‘টাইমওয়াচ’-এর একটি পর্বে রবিন এলিস এই ইতিহাসকে হারিয়ে যাওয়া এক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয়রা তখন সমুদ্রপথে আমেরিকায় পৌঁছালেও তাদের অভিযানের বিবরণ অনেকাংশে থেকে যেত সমুদ্রযাত্রার মৌখিক স্মৃতি ও উপাখ্যানে।
আইসল্যান্ড থেকে গ্রিনল্যান্ড, তারপর উত্তর আমেরিকা
ইতিহাসবিদদের বিবরণ অনুযায়ী, আনুমানিক ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে নর্সরা আইসল্যান্ডে পৌঁছান। এর প্রায় এক শতাব্দী পর তাদের অভিযাত্রা বিস্তৃত হয় গ্রিনল্যান্ড পর্যন্ত। পরে গ্রিনল্যান্ডকে যাত্রাবিরতির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে তারা উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে পৌঁছান।
বর্তমান কানাডার বাফিন দ্বীপে পৌঁছাতে ডেভিস প্রণালি দিয়ে প্রায় ২০০ মাইল জলপথ পাড়ি দিতে হতো। নর্স নাবিকেরা দ্বীপটির নাম দিয়েছিলেন ‘হেলুল্যান্ড’, যার অর্থ পাথরের ফলকের ভূমি। এরপর উপকূল ধরে দক্ষিণে এগিয়ে তারা বর্তমান ল্যাব্রাডর অঞ্চলে পৌঁছান। জায়গাটিকে তারা নাম দেন ‘মার্কল্যান্ড’, যার অর্থ বনভূমি।
সেখান থেকে আরও দক্ষিণে এগিয়ে তারা এমন এক অঞ্চলের সন্ধান পান, যার নাম দেওয়া হয় ‘ভিনল্যান্ড’ বা আঙুরলতার ভূমি। নর্স সাগায় এই অঞ্চলকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযাত্রা ও বসতি স্থাপনের বিবরণ রয়েছে।
২০১৬ সালে ‘টাইমওয়াচ’-এ আইসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এমিলি লেথব্রিজ বলেন, সাগাগুলোতে শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর কথা বলা হয়নি; বরং বিভিন্ন অঞ্চলে থামা এবং কয়েক বছর ধরে সেখানে যাতায়াতের বিবরণও রয়েছে। তার মতে, এসব অভিযানের মধ্য দিয়ে নর্সদের সামনে নতুন ভূখণ্ড ও অজানা পরিবেশের দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল।
এরিক দ্য রেডের নির্বাসন ও গ্রিনল্যান্ড অভিযান
প্রাচীন নর্স সাগায় এরিক দ্য রেডকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বসতি স্থাপনকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তার বাবা নরওয়েতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নির্বাসিত হয়ে আনুমানিক ৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে আইসল্যান্ডে আশ্রয় নেন।
এর আগে, ৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে আইসল্যান্ডে ‘আলথিং’ নামে একটি জাতীয় সমাবেশ বা পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে আইন প্রণয়ন ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতি গ্রীষ্মে অধিবেশন বসত। প্রাকৃতিক গিরিখাতের মধ্যে অবস্থিত এই সমাবেশস্থল ভূতাত্ত্বিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি এর অবস্থান।
গবেষক লেথব্রিজের ব্যাখ্যায়, আলথিংয়ে প্রচলিত আইন ভঙ্গকারীদের নির্বাসনের মতো কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। নির্বাসিত ব্যক্তিরা অন্য কোথাও যেতে পারলেও নির্দিষ্ট মেয়াদে আইসল্যান্ডে ফিরে আসতে পারতেন না।
৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিবেশী এক কৃষকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী বিরোধে জড়িয়ে এরিক দ্য রেডও আইসল্যান্ড থেকে নির্বাসিত হন। পরে তিনি গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছে সেখানে ইউরোপীয় বসতি গড়ে তোলেন। লেথব্রিজের মতে, এরিকই প্রথম আইসল্যান্ডবাসী, যিনি গ্রিনল্যান্ডে স্থায়ী মানববসতি প্রতিষ্ঠা করেন।
গ্রিনল্যান্ডে নর্সদের এই উপনিবেশ প্রায় পাঁচ শতাব্দী টিকে ছিল। পরবর্তী সময়ে এটি উত্তর আমেরিকার অজানা ভূখণ্ডে তাদের অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
লেইফ এরিকসনের নেতৃত্বে নতুন ভূখণ্ডে যাত্রা
এরিক দ্য রেডের ছেলে লেইফ এরিকসনের নেতৃত্বে ভাইকিং নাবিকেরা গ্রিনল্যান্ড থেকে একাধিকবার উত্তর আমেরিকায় যাতায়াত করেছিলেন বলে গবেষকদের ধারণা। তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল নতুন ভূখণ্ড অনুসন্ধান এবং সেখানে বসতি স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা।
কানাডার মিউজিয়াম অব সিভিলাইজেশনের প্রত্নতত্ত্ববিদ রবার্ট ম্যাকগি বিবিসির ‘টাইমওয়াচ’-কে বলেন, সাধারণভাবে মনে করা হয়, লেইফ এরিকসন ও তার সঙ্গীরা একবার ভিনল্যান্ডে পৌঁছানোর পর নতুন পৃথিবীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, পরবর্তী দুই থেকে তিন শতাব্দী ধরেও নর্সরা বিরতি দিয়ে ওই অঞ্চলে যাতায়াত বজায় রেখেছিলেন।
এ থেকে বোঝা যায়, উত্তর আমেরিকায় ভাইকিংদের উপস্থিতি কেবল একবারের বিচ্ছিন্ন অভিযান ছিল না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে অনুসন্ধান ও যোগাযোগের একটি ধারাবাহিকতা ছিল।
কলম্বাস কি ভিনল্যান্ডের কথা জানতেন?
মধ্যযুগে গ্রিনল্যান্ড ও উত্তর আমেরিকার উপকূলের মধ্যে নৌযাত্রা অব্যাহত ছিল বলে মনে করেন মধ্যযুগীয় নৌযাত্রার ইতিহাসবিদ কার্স্টেন সিভার। তার মতে, ১৪৮০ সালের দিকে ইউরোপীয় নাবিকেরা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর জন্য পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালান। তারা গন্তব্য অঞ্চলকে ‘ব্রাজিল দ্বীপ’ নামে উল্লেখ করতেন বলে তিনি জানান।
সিভারের ব্যাখ্যায়, এটি উত্তর আমেরিকায় পৌঁছানোর প্রথম প্রচেষ্টা ছিল না; বরং গ্রিনল্যান্ডকে মধ্যবর্তী যাত্রাবিরতি হিসেবে ব্যবহার না করে সরাসরি সেখানে পৌঁছানোর প্রথম আনুষ্ঠানিক উদ্যোগগুলোর একটি ছিল।
ক্রিস্টোফার কলম্বাস এসব অভিযানের বিষয়ে জানতেন কি না, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে সিভার ১৪৯৭-৯৮ সালের শীতকালে ইংরেজ নাবিক জন ডের লেখা একটি চিঠির উল্লেখ করেন। চিঠিতে ১৪৯৭ সালে জন ক্যাবটের উত্তর আমেরিকা অভিযানের বিবরণ তুলে ধরার পাশাপাশি বলা হয়েছিল, ব্রিস্টলের অভিজ্ঞ নাবিকেরা কলম্বাসের অভিযানের বহু বছর আগ থেকেই উত্তরাঞ্চলীয় জলপথে বাণিজ্য ও অনুসন্ধান চালিয়ে আসছিলেন।
এই চিঠি থেকে ইউরোপীয় নাবিকদের মধ্যে উত্তর আটলান্টিকের পুরোনো নৌপথ সম্পর্কে জ্ঞানের আদান-প্রদানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে কলম্বাস ঠিক কতটা জানতেন কিংবা তার অভিযানের পথ বেছে নেওয়ার পেছনে ভিনল্যান্ড সম্পর্কে কোনো ধারণা কাজ করেছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
রবার্ট ম্যাকগির মতে, উত্তর গোলার্ধে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ক্ষেত্রে উত্তরের পথ ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে। তা সত্ত্বেও কলম্বাস আটলান্টিক পেরিয়ে সরাসরি পশ্চিমমুখী দীর্ঘ পথ বেছে নিয়েছিলেন। ম্যাকগি মনে করেন, কলম্বাসের মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকায় থামা নয়, বরং এশিয়ার সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলে পৌঁছানো। তবে কানাডার উপকূল বা ভিনল্যান্ড এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য তার ছিল কি না, সেটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও অনুমানের বিষয়।
কলম্বাসের আগেই ইউরোপীয় উপস্থিতির ইতিহাস
প্রতি অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন স্থানে কলম্বাসের অভিযাত্রা স্মরণ করা হয়। তবে উত্তর আমেরিকায় ইউরোপীয়দের প্রথম উপস্থিতির ইতিহাস কেবল ১৪৯২ সালের ঘটনা দিয়ে শুরু হয় না। নর্স সাগার বিবরণ, গ্রিনল্যান্ডের বসতির ইতিহাস এবং কানাডার ল’আঁস ও মেডোজের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রমাণ করে, ভাইকিংরা তার বহু শতাব্দী আগেই উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন।
আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে ধাপে ধাপে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া এসব অভিযাত্রী অজানা ভূখণ্ডে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। ফলে আমেরিকায় ইউরোপীয় অভিযানের ইতিহাস বুঝতে কলম্বাসের পাশাপাশি ভাইকিংদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

