দ্রুত ক্লাস শুরুর কর্মপরিকল্পনা ও একাডেমিক রিকভারি প্ল্যান তৈরির উদ্যোগ, টানা ২১ দিনের শাটডাউনে ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) চলমান অচলাবস্থা নিরসনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। একই সঙ্গে দ্রুত নিয়মিত ক্লাস শুরু করতে শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করে কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
টানা শাটডাউনে ব্যাহত হওয়া ক্লাসের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একাডেমিক রিকভারি প্ল্যান বা একাডেমিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও জানিয়েছেন নতুন উপাচার্য।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ক্যাম্পাসে যোগদানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর আশা
অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি শুনে যুক্তিসংগত দাবিগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের দপ্তরের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান তিনি।
উপাচার্য বলেন, কোনো সমস্যা তৈরি হলে সেখানে আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে। আর সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো আলাপ-আলোচনা। সবার লক্ষ্য যদি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।
তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁদের বক্তব্য ও প্রত্যাশা বোঝা গেলে চলমান সংকট নিরসনের পথ তৈরি হবে।
দ্রুত ক্লাস শুরুর কর্মপরিকল্পনা
দীর্ঘদিন ক্লাস বন্ধ থাকায় বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ ব্যাচের অনেক শিক্ষার্থী ক্লাস শুরুর বিষয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এমনকি ২০২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও দ্রুত ক্লাসে ফিরতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেন, তিনি নিজেও ক্লাস নিতে চান এবং অনেক শিক্ষকও পাঠদান কার্যক্রমে ফিরতে আগ্রহী। শিক্ষার্থীদের দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরপ্রধান ও বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে পরামর্শ করে অল্প সময়ের মধ্যে ক্লাস শুরুর সূচি জানানো হবে।
ক্লাসের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একাডেমিক রিকভারি প্ল্যান
টানা শাটডাউনে প্রায় তিন সপ্তাহের ক্লাস ব্যাহত হয়েছে উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একাডেমিক রিকভারি প্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ক্ষেত্রে সেমিস্টারের টার্ম ব্রেক কমানো কিংবা পরীক্ষার ফল দ্রুত প্রকাশের মতো বিকল্প নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা পাওয়া গেলে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করা সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনে গুরুত্ব
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও তাঁদের আস্থা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নতুন উপাচার্য। অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেন, আন্দোলনকারীরা তাঁর ছোট ভাইয়ের মতো। শিক্ষক হিসেবে তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, বক্তব্য শোনা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বোঝানো তাঁর দায়িত্ব।
শিক্ষার্থীরা তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
ক্যাম্পাসে যোগদানে বিলম্বের ব্যাখ্যা
ক্যাম্পাসে যোগদানে বিলম্বের বিষয়ে উপাচার্য জানান, গত ২২ সেপ্টেম্বর আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরামর্শ করেছেন তিনি। আলোচনার অগ্রগতি বিবেচনা করে পরে ক্যাম্পাসে এসে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন।
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করে শেখ শরীফুল আলম বলেন, সায়েম একজন ভালো শিক্ষক ও গবেষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে তাঁর সহযোগিতা প্রয়োজন। তাঁরা একে অপরের প্রতিপক্ষ নন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
উপাচার্য ভবনে তালা, ক্যাম্পাসে উত্তেজনা
এর আগে সোমবার সকালে প্রশাসনিক ভবন-২-এর তালা ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তাঁকে ঘিরে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নেন এবং তাঁর কক্ষে তালা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে উপাচার্যকে ভেতরে রেখেই ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন তাঁরা।
২১ দিন ধরে চলছে সর্বাত্মক শাটডাউন
গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্যের পদ থেকে অপসারণ করে কুয়েটের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওই রাতেই আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক শাটডাউন চলছে। এতে টানা ২১ দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের এ অচলাবস্থায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রমে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে নিয়মিত কার্যক্রমে ফেরাই এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

