ইরানে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা কমার ইঙ্গিত এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল সরবরাহের ঘোষণায় স্বস্তি ফিরেছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। একই সঙ্গে ওপেনএআইয়ের আয় নিয়ে উদ্বেগ কাটিয়ে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারেও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। চীন-ইইউ বাণিজ্য সমঝোতাও ইউরোপের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত বক্তব্য, রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল সরবরাহের ঘোষণা এবং প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে পুনরুদ্ধারের প্রভাবে শুক্রবার বিশ্ব শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। একই সময়ে চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে হাইব্রিড গাড়ি রপ্তানি নিয়ে সমঝোতার খবর ইউরোপের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও শুক্রবার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
ইরানে হামলা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে স্বস্তি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না চালানোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা তৈরি করতে হোয়াইট হাউস পেন্টাগনকে অনুরোধ জানিয়েছে বলে এর আগে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা সামনে আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।
তবে ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক বক্তব্য এলেও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে—এমনটা নিশ্চিত নয়। ফলে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর সংঘাতের প্রভাব নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে।
রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহের ঘোষণা
শুক্রবার বিকেলে ট্রাম্প জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়েছেন। এ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
জ্বালানি সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এডওয়ার্ড জোনসের বিশ্লেষক অ্যাঞ্জেলো কুরকাফাসের মতে, এ উদ্যোগ জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে তৈরি হওয়া সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কা কিছুটা কমাতে সহায়তা করছে।
তবে সরবরাহের পরিমাণ, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুনির্দিষ্ট শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছাড়া বিশ্ববাজারে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে তেহরান বাধা সৃষ্টি করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির মূল্য এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়ে।
অনলাইন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম আইজির প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প মনে করেন, ট্রাম্পের বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তর্নিহিত উত্তেজনা ও সমস্যার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, ‘তেলবাহী জাহাজের ভাড়া ও বিমার খরচ যত দিন বর্তমানের মতো উচ্চ পর্যায়ে থাকবে, তত দিন তেলের দাম টেকসইভাবে কমার সম্ভাবনা অনেক কম—এমনকি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও।’
অর্থাৎ, জ্বালানি সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা বাজারকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও পরিবহন ও বিমা ব্যয় বেশি থাকলে তেলের দাম কমার ক্ষেত্রে তা বড় বাধা হয়ে থাকতে পারে।
ওপেনএআইয়ের আয় নিয়ে উদ্বেগ কাটিয়ে প্রযুক্তি শেয়ারে পুনরুদ্ধার
জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি শুক্রবার প্রযুক্তি খাতের শেয়ারেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। আগের দিন ওপেনএআইয়ের সম্ভাব্য আয় নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে প্রযুক্তি খাতে দরপতন হয়েছিল।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর ওপেনএআইয়ের বার্ষিক হিসাবে আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা আগে উল্লেখ করা ৭০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। এ খবরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য রিটার্ন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে পরে ব্লুমবার্গ অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, ওপেনএআই আগের ৭০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রত্যাশা করছে। ফলে আয় নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে আসে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পেপারস্টোনের বিশ্লেষক ক্রিস ওয়েস্টন বলেন, ‘আয়ের এই পার্থক্য ওপেনএআইয়ের মূল ব্যবসার অবনতি না বুঝিয়ে বরং আয় পরিমাপের পদ্ধতিগত পার্থক্যের প্রতিফলন হতে পারে।’
বিশ্লেষকদের এ ধরনের মূল্যায়ন প্রযুক্তি খাতের আয়সংক্রান্ত তথ্য ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। কারণ, বড় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়, ব্যয় এবং বিনিয়োগের প্রত্যাশা পুরো প্রযুক্তি খাতের বাজারমূল্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
নাসডাকের পতনের পর ঘুরে দাঁড়াল প্রযুক্তি খাত
ওপেনএআইয়ের আয় নিয়ে উদ্বেগের প্রভাবে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক কম্পোজিট সূচক এক শতাংশের বেশি কমে যায়। ওই দিন বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম প্রায় ৩ শতাংশ কমেছিল। মাইক্রোসফট, এএমডি ও অ্যামাজনের শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য দরপতন দেখা যায়।
তবে শুক্রবার পরিস্থিতির উন্নতি হয়। দিন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এশিয়ার অধিকাংশ বাজারেও সূচক বেড়েছে। ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোও আগের দুর্বলতা কাটিয়ে উল্লেখযোগ্য দরবৃদ্ধি নিয়ে লেনদেন শেষ করেছে।
শুক্রবার মাইক্রোসফটের শেয়ারের দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং অ্যামাজনের শেয়ারের দাম ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।
অনলাইন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ইটোরোর বিশ্লেষক জশ গিলবার্ট বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয় প্রকাশের মৌসুম শুরু হলে প্রযুক্তি খাতের জন্য বড় পরীক্ষা সামনে আসবে। তখন এআই খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেখাতে হবে, তারা আগের মতো বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত কি না।
এআই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে প্রত্যাশা বাড়ার পাশাপাশি বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে পর্যাপ্ত আয় ও মুনাফা অর্জন করা যাবে কি না, তা নিয়েও বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
চীন-ইইউ সমঝোতায় ইউরোপের গাড়ি নির্মাতাদের শেয়ারে উত্থান
এদিকে, হাইব্রিড গাড়ি রপ্তানি নিয়ে চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সমঝোতার খবরও বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ইইউর বাণিজ্যবিষয়ক প্রধান জানিয়েছেন, চীনা হাইব্রিড গাড়ির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।
এ সমঝোতার ফলে ইউরোপের বাজারে বিপুলসংখ্যক চীনা গাড়ি প্রবেশের সম্ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রত্যাশা। এর মাধ্যমে চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও কিছুটা কমেছে।
সমঝোতার খবরে ইউরোপের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিএমডব্লিউ, রেনো ও ভক্সওয়াগেনের শেয়ারের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমার ইঙ্গিত বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে গাড়ি শিল্পের মতো প্রতিযোগিতামূলক খাতে শুল্ক, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা কমলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সামনে জ্বালানি বাজার ও এআই খাতের দিকেই নজর বিনিয়োগকারীদের
শুক্রবারের বাজার পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা, জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা হ্রাস—এই তিনটি বিষয় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের বাস্তবায়ন, জ্বালানির পরিবহন ব্যয় এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক ফলাফলের ওপর।
একই সঙ্গে চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সমঝোতা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সাময়িক স্বস্তির মধ্যেও বৈশ্বিক অর্থনীতির সামনে ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।

