বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

৭০ বছর পর ব্রহ্মপুত্রে ফিরল আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য, আসাম থেকে পণ্যবাহী জাহাজ ঢাকার পথে

৫৪০ টন মিথানল নিয়ে ডিব্রুগড় থেকে পানগাঁওয়ের উদ্দেশে যাত্রা; নতুন করিডোরে বাংলাদেশ–ভারত বাণিজ্যে সম্ভাবনার দুয়ার

প্রায় সাত দশক পর ভারতের আসামের ঐতিহাসিক ডিব্রুগড় নদীবন্দর থেকে আবার আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজের যাত্রা শুরু হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র দিয়ে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে একটি বার্জ বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ঘটনাটিকে দেশটির স্বাধীনতার পর উজান আসাম থেকে কোনো বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে প্রথম আন্তর্জাতিক কার্গো চালান হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সোমবার (৫ অক্টোবর) আসামের ডিব্রুগড়ের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ‘DLB Patkai’ নামের বার্জটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এর যাত্রা উদ্বোধন করেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন।

জাহাজটিতে থাকা ৫৪০ টন মিথানল উৎপাদন করেছে আসামের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান Assam Petro-Chemicals Limited (APCL)। চালানটির গন্তব্য ঢাকার পানগাঁও বন্দর।

ভারতের সরকারি প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (PIB), Times of India, Hindustan Times ও Telegraph India-র প্রতিবেদনে এই যাত্রাকে ডিব্রুগড়ের প্রায় হারিয়ে যাওয়া নদীবাণিজ্যের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্র হয়ে ১,৩০০ কিলোমিটারের যাত্রা

পণ্যবাহী জাহাজটি প্রথমে ভারতের National Waterway-2 (NW-2) ধরে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার অতিক্রম করে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর India-Bangladesh Protocol Route (IBPR) ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে।

বগিবিল থেকে বাংলাদেশে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথ প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার। মিথানলের চালানটি শেষ পর্যন্ত ঢাকার পানগাঁও বন্দরে পৌঁছানোর কথা।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এই যাত্রাকে শুধু একটি পণ্য চালান হিসেবে দেখছে না। ব্রহ্মপুত্রকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পরিবহনের একটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে এ যাত্রাকে। নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

যে পথে একসময় চলত চা, কাঠ ও যাত্রীবাহী স্টিমার

ডিব্রুগড়ের সঙ্গে নদীপথের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরোনো।

ভারতীয় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৮৫৬ সালেই কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড় পর্যন্ত চলাচল করত। ১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাটকে কেন্দ্র করে দিব্রু–সাদিয়া রেলপথ চালু হয়। ১৯১৩ সালের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে প্রতিদিন ডিব্রুগড়ে স্টিমার চলত। এসব নৌযানে চা, কাঠ ও যাত্রী পরিবহন করা হতো।

তৎকালীন আসামের অর্থনীতির সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগে নদীপথটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগে পুরোনো পরিবহন কাঠামো বড় ধরনের ধাক্কা খায়। আসাম থেকে কলকাতামুখী ঐতিহাসিক পথের একটি বড় অংশ তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ডের মধ্যে পড়ে যায়।

এরপর ১৯৫০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ডিব্রুগড় এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের নদীতলেও পরিবর্তন আসে। ১৯৫৪ সালে ডিব্রুগড় ঘাট থেকে নিয়মিত বুকিং বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ঘাটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে চা পরিবহনও ক্রমে রেলপথে স্থানান্তরিত হয়।

১৯৬৫-তে বন্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের পর নতুন অধ্যায়

১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের পর আন্তঃসীমান্ত নদীবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারত নৌপথে বাণিজ্য ও ট্রানজিটের জন্য একটি প্রটোকল স্বাক্ষর করে। এর ধারাবাহিকতায় দুই দেশের মধ্যে প্রটোকলভুক্ত নদীপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়।

১৯৮৮ সালে ব্রহ্মপুত্রের সাদিয়া থেকে ধুবরি পর্যন্ত প্রায় ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে ভারতের National Waterway-2 ঘোষণা করা হয়।

তবে ডিব্রুগড়কেন্দ্রিক পুরোনো আন্তর্জাতিক নদীবাণিজ্য আর আগের অবস্থায় ফেরেনি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পান্ডু থেকে ধুবরিতে সিমেন্ট পরিবহনের মাধ্যমে এ নৌপথে নিয়মিত কার্গো কার্যক্রম নতুন গতি পেতে শুরু করে।

বাংলাদেশ হয়ে আবার সচল ব্রহ্মপুত্র

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশকে যুক্ত করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নৌযোগাযোগে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাটা স্টিলের পণ্যবাহী বার্জ বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহার করে আসামের পান্ডুতে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে আলোচিত প্রমোদতরী MV Ganga Vilas বাংলাদেশ হয়ে বারাণসী থেকে ডিব্রুগড় পর্যন্ত যাত্রা করে।

বগিবিল যাত্রী ও কার্গো টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এবং এটি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হয়। পরে সেখানে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সুবিধা গড়ে তোলায় সরাসরি আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশমুখী এই প্রথম চালানের তাৎপর্য শুধু ৫৪০ টন মিথানল পরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রুটটি নিয়মিত ও বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হলে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে নতুন ধরনের সরবরাহব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আসামসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পেট্রোকেমিক্যাল, কয়লা, চুনাপাথর, কৃষিপণ্য, চা এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের ভৌগোলিক নৈকট্য রয়েছে। নদীপথের কার্যকর ব্যবহার দুই পক্ষের পণ্য পরিবহনে বিকল্প লজিস্টিকস সুবিধা তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের পানগাঁও, নারায়ণগঞ্জ ও সংশ্লিষ্ট নদীবন্দরগুলোর মাধ্যমে পণ্য ওঠানামা বাড়লে বন্দরসেবা, নৌপরিবহন, গুদামজাতকরণ ও লজিস্টিকস খাতে নতুন বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে পরিবহন ব্যয়, নিয়মিত কার্গোর পরিমাণ, নাব্যতা, বন্দর সক্ষমতা, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক নীতির ওপর। অর্থাৎ প্রথম চালানটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধার মাত্রা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম Moneycontrol-ও নতুন সংযোগটিকে উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাব্য নতুন বাণিজ্য করিডোর হিসেবে দেখেছে।

সড়কের ওপর চাপ কমানোর সম্ভাবনা

নদীপথে ভারী ও বাল্ক পণ্য পরিবহন সাধারণত বড় পরিমাণ কার্গো একসঙ্গে নেওয়ার সুযোগ দেয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, ব্রহ্মপুত্রকেন্দ্রিক পরিবহন বাড়লে সড়কপথের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহার ও পরিবহন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালও নদীপথে বেশি পণ্য পরিবহনকে কম জ্বালানি ব্যবহার ও সড়কে ট্রাকের চাপ কমানোর সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

ভারতের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশটির জাতীয় নৌপথগুলোতে কার্গো পরিবহন ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছেছে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের নৌপথ উন্নয়নে ৬ হাজার ৮০০ কোটি রুপির বেশি বিনিয়োগের কথাও জানিয়েছে ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয়।

আঞ্চলিক বাণিজ্যেরও নতুন সম্ভাবনা

ভারত শুধু বাংলাদেশের সঙ্গেই নয়, বাংলাদেশকে সংযুক্ত করে নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক নৌযোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন সর্বানন্দ সোনোয়াল।

এ কারণে ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে প্রথম চালানটির সাফল্য ভবিষ্যতে বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্য কাঠামোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এখানে সুযোগের পাশাপাশি কৌশলগত বাণিজ্যিক স্বার্থও রয়েছে। বাংলাদেশের নৌপথ ও বন্দর ব্যবহার বাড়লে দেশকে শুধু ট্রানজিট রুট হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও বাণিজ্য সংযোগের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সে সুবিধা নিশ্চিত করতে পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, ন্যায্য ফি ও চার্জ, দেশীয় নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং বাংলাদেশের বন্দর ও অবকাঠামোর অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হবে।

প্রায় ৭০ বছর পর ডিব্রুগড়ের ঘাট থেকে আবার আন্তর্জাতিক গন্তব্যের উদ্দেশে পণ্যবাহী জাহাজ ছাড়ার মধ্য দিয়ে তাই শুধু একটি পুরোনো নদীপথই ফিরে আসেনি—ব্রহ্মপুত্রকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যিক যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনাও সামনে এসেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন