বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

সরবরাহে ঘাটতি নেই, তবু বাজারে চড়া এলপিজি—তদন্তে সরকার

বিইআরসির নির্ধারিত ১,৫৮৫ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার কোথাও ১,৯০০–২,১০০ টাকা • কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ডিসিদের নির্দেশ • মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসবে সরকার

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহে ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছে সরকার। অথচ বাজারে ভিন্ন চিত্র—অনেক জায়গায় নির্ধারিত দামে মিলছে না রান্নার গ্যাস। কোথাও কোথাও ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা। অথচ সেপ্টেম্বরে এই সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও বাজারে কেন সংকটের অভিযোগ এবং কীভাবে সিলিন্ডারপ্রতি কয়েক শ টাকা বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে এবার তার কারণ অনুসন্ধানে নেমেছে সরকার।

দেশের কোথাও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মূল্যে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করে তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন দিতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয় থেকে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে অনলাইনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন।

নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫১৫ টাকা পর্যন্ত বেশি

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বেসরকারি এলপিজির খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ১৩২ টাকা ১২ পয়সা নির্ধারণ করে। সে হিসাবে বহুল ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

কিন্তু মাসের শেষ দিকে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার বাজারে একই সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

সে হিসাবে একজন ভোক্তাকে সিলিন্ডারপ্রতি নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রায় ৩১৫ থেকে ৫১৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। শতাংশের হিসাবে বাড়তি দাম প্রায় ২০ থেকে ৩২ শতাংশ।

শুধু বেশি দামই নয়, কোনো কোনো এলাকায় বাড়তি মূল্য দিয়েও চাহিদামতো সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সরকার বলছে—ঘাটতি নেই

বাজারে সংকটের অভিযোগের মধ্যেই জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে এলপিজির সামগ্রিক সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই।

তাহলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে কেন—জেলা প্রশাসকদের তদন্তে এই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কোন এলাকায় কত দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে, বিইআরসি নির্ধারিত মূল্য কার্যকর হচ্ছে কি না, কোথাও ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ সীমিত রাখা হচ্ছে কি না এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির সঙ্গে কোনো পক্ষ জড়িত রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।

মন্ত্রী জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমদানিকারক ও এলপিজি খাতের সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। কোনো এলাকায় প্রকৃত সরবরাহ ঘাটতি পাওয়া গেলে সেখানে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

খুচরা বিক্রেতাদের দাবি—উৎসেই দাম বেশি

বাজারের বাড়তি দাম নিয়ে খুচরা বিক্রেতাদেরও ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। তাদের একাংশের দাবি, পরিবেশক বা সরবরাহ পর্যায় থেকেই বিইআরসি নির্ধারিত খুচরা মূল্যের কাছাকাছি কিংবা তার চেয়েও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। ফলে কমিশন নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনে কয়েকজন বিক্রেতার বরাতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের ক্রয়মূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।

এই দাবি সঠিক হলে প্রশ্নটি শুধু খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আমদানিকারক থেকে অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতা হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ও মূল্যশৃঙ্খল পরীক্ষা করার প্রয়োজন দেখা দেয়।

সরবরাহের তথ্যেও প্রশ্ন

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বরের এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।

একটি প্রতিবেদনে বিইআরসি ও খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে আগস্টের প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টনের তুলনায় সেপ্টেম্বরে আমদানি প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনে নেমে আসার কথা বলা হয়। কয়েকটি নির্ধারিত কার্গো সময়মতো না আসার কারণে সাময়িক সরবরাহ সমস্যার কথাও সেখানে উঠে আসে।

অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে আগস্টে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি এবং সেপ্টেম্বরেও কাছাকাছি পরিমাণ আমদানির তথ্য দেওয়া হয়েছে।

ফলে সেপ্টেম্বরের চূড়ান্ত আমদানি, বন্দরে খালাস, কোম্পানিগুলোর মজুত এবং বাজারে সরবরাহ এই চার পর্যায়ের সমন্বিত তথ্য ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধুই ‘কৃত্রিম সংকট’ হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন।

অতিরিক্ত দাম নিলে কঠোর ব্যবস্থা

জ্বালানিমন্ত্রী সতর্ক করে জানিয়েছেন, তদন্তে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরির সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইভাবে বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বাজারে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে জেলা প্রশাসকদের আরও সক্রিয় ও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সামনে তিন প্রশ্ন

সরকারের তদন্তে এখন মূলত তিনটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি প্রথমত, দেশে চাহিদার তুলনায় এলপিজির প্রকৃত সরবরাহ কত; দ্বিতীয়ত, আমদানিকারক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত কোন পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে; তৃতীয়ত, বাজারের সংকটটি বাস্তব সরবরাহ সমস্যার ফল, নাকি কোনো পর্যায়ে মজুত বা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে।

বিইআরসি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারদরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিবেচনায় এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে। কিন্তু সেই দাম যদি শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে কার্যকর না হয়, তাহলে শুধু মূল্য ঘোষণা নয়—সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

নির্ধারিত মূল্য: ১,৫৮৫ টাকা
বাজারদর: ১,৯০০–২,১০০ টাকা
বাড়তি আদায়: ৩১৫–৫১৫ টাকা
পার্থক্য: প্রায় ২০–৩২ শতাংশ

সরকারের তদন্তে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর প্রত্যাশিত সরবরাহে ঘাটতি না থাকলে ১ হাজার ৫৮৫ টাকার এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাজারে ২ হাজার টাকা ছাড়াচ্ছে কেন?


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন