সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তদন্তে ৮৫% অভিযোগের সত্যতা, তবু বিচার অধরা: কাদের ছায়ায় বেপরোয়া চাঁদাবাজরা?

ঢাকায় ২০ মাসে ৭২৩ মামলা • তদন্ত শেষ ৪২৫টির • ৩৬৫টিতে চার্জশিট • এখনো তদন্তে ২৯৮ মামলা • পুলিশের তালিকায় প্রায় ১,২০০ চাঁদাবাজ • রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদন

মামলা হচ্ছে, গ্রেপ্তার হচ্ছে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতাও মিলছে। শত শত মামলায় আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। এরপরও রাজধানীর বাজার, ফুটপাত, পরিবহন স্ট্যান্ড, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে নির্মাণ ও আবাসন প্রকল্প, নানা জায়গায় থামছে না চাঁদাবাজির অভিযোগ।

বরং পুলিশেরই তথ্য সামনে আনছে আরও উদ্বেগজনক চিত্র। গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার ৫০ থানার মধ্যে ৪৯টিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে ৭২৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে তদন্ত শেষ হওয়া ৪২৫ মামলার ৩৬৫টিতেই অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। অর্থাৎ তদন্ত শেষ হওয়া মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশেই অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। ৬০টি মামলায় দেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন। এখনো তদন্তাধীন ২৯৮টি মামলা।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ এই ৮৫ শতাংশ আদালতে অপরাধ প্রমাণের হার নয়। এটি পুলিশের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার হিসাব। অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের।

তবে এত বিপুলসংখ্যক মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও চাঁদাবাজি কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না সেই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো।

পুলিশের তালিকায় প্রায় ১,২০০ চাঁদাবাজ

পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানে রাজধানীর ৪৫ থানা এলাকায় সক্রিয় প্রায় ১,২০০ চাঁদাবাজকে চিহ্নিত করার তথ্য উঠে এসেছে।

ওই প্রতিবেদনে শুধু চাঁদাবাজ নয়, তাদের পেছনে থাকা কথিত আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিষয়ও উঠে আসে। প্রায় ৩২৯ জনকে আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়; তাদের একটি অংশের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। কয়েক ডজন ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে আসে।

রাজনৈতিক পরিচয়—পাল্টা বক্তব্যও আছে

চাঁদাবাজদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ নতুন নয়। পুলিশের ওই প্রতিবেদনেও কিছু তালিকাভুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে অধিকাংশ চিহ্নিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ ছিল না।

অভিযোগের বিষয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোও তাদের অবস্থান জানিয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজিতে জড়ালে তাকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দলটির নেতারা বিএনপিকে ঢালাওভাবে চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযান আছে, গ্রেপ্তারও আছে—তবু থামছে না কেন?

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রাজধানীতে একাধিক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মে মাসে বিশেষ অভিযান শুরুর প্রথম দুই দিনেই ৫৮ জন তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ এবং তাদের ৯৪ সহযোগীসহ ১৫২ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ।

পরবর্তী সময়ে ডিএমপি জানায়, অভিযান শুরুর পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকশ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তারপরও নতুন করে চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে আসছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে শুধু মাঠপর্যায়ের চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করলেই কি এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব? নাকি এর পেছনের অর্থনৈতিক ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্কও শনাক্ত করা প্রয়োজন?

বাজার-ফুটপাত পেরিয়ে নির্মাণ প্রকল্পেও অভিযোগ

চাঁদাবাজির অভিযোগ এখন কেবল ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড বা কাঁচাবাজারে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত এবং নির্মাণ ও আবাসন প্রকল্প ঘিরেও বিভিন্ন সময়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ সামনে এসেছে।

কোথাও ব্যবসা পরিচালনা, কোথাও পরিবহন চালানো, আবার কোথাও নির্মাণকাজ নির্বিঘ্ন রাখার বিনিময়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের অবৈধ অর্থ আদায় শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য, পরিবহন, বাসাভাড়া কিংবা বিভিন্ন সেবার মূল্যেও পড়তে পারে।

ফলে চাঁদাবাজির মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেও বহন করতে হয়।

আইন আছে, শাস্তিও কঠোর

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে।

দণ্ডবিধির ৩৮৪ ধারায় চাঁদাবাজির জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। আবার কাউকে ক্ষতির ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির চেষ্টা এবং মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

অর্থাৎ আইনের অনুপস্থিতি নয়; বড় প্রশ্ন হচ্ছে আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ, দ্রুত তদন্ত এবং বিচারিক নিষ্পত্তি।

চার্জশিটের পর কী হচ্ছে?

চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান ও তদন্তের পাশাপাশি এখন বিচারিক অগ্রগতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কারণ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর চার্জশিট দেওয়া হলো অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি ধাপ মাত্র। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ, প্রমাণ যাচাই এবং বিচার শেষে আদালতই নির্ধারণ করেন অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী কি না।

ফলে শুধু কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন বা কতটি চার্জশিট হয়েছে তার পাশাপাশি কতটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে, কতজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং কতজন খালাস পেয়েছেন সেই হিসাবও জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন।

কাদের ছায়ায় এত সাহস?

প্রায় ১,২০০ চাঁদাবাজের তথ্য, শত শত কথিত আশ্রয়দাতা, শত শত মামলা এবং তদন্ত শেষ হওয়া মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশে অভিযোগের সত্যতা—সবকিছু মিলিয়ে চাঁদাবাজি যে বিচ্ছিন্ন কয়েকজন অপরাধীর সমস্যা নয়, সেই প্রশ্ন আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করার মতো সিদ্ধান্ত এসব তথ্য থেকে টানা যায় না। বরং প্রয়োজন প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যার বিরুদ্ধেই প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধে একইভাবে আইন প্রয়োগ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চাঁদা আদায়কারীকে গ্রেপ্তার করলেই স্থায়ী সমাধান আসবে না। খুঁজে বের করতে হবে অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা অপরাধীদের আশ্রয় দিচ্ছে এবং গ্রেপ্তারের পর একই এলাকায় নতুন চাঁদাবাজ কীভাবে জায়গা নিচ্ছে।

কারণ একজন চাঁদাবাজকে সরিয়ে আরেকজন তার জায়গা নিলে অভিযান চলবে, গ্রেপ্তারও হবে কিন্তু চাঁদাবাজির ব্যবস্থা থেকে যাবে।

রাজধানীতে শত শত মামলা এবং তদন্তে বিপুলসংখ্যক অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তাই প্রশ্নটি এখন আরও স্পষ্ট—

আইন আছে, অভিযান আছে, গ্রেপ্তারও আছে, তবু কাদের ছায়ায় এত বেপরোয়া চাঁদাবাজরা?


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন