রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বদলাচ্ছে কি বাংলাদেশের সংসদীয় সংস্কৃতি?

তিন অধিবেশনে আইন, প্রশ্নোত্তর ও কমিটিতে বাড়তি সক্রিয়তা • সরকার-বিরোধী দলের সহযোগিতার নতুন বার্তা • তবে কার্যকর সংসদের আসল পরীক্ষা হবে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করায়

বিশেষ প্রতিবেদন | প্রান্তকাল

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির বড় সমালোচনা ছিল—রাজনৈতিক বিভাজন, বিরোধী দলের সংসদ বর্জন, সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব এবং আইন প্রণয়ন ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংসদের প্রত্যাশিত ভূমিকা না থাকা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সেই সংস্কৃতি বদলের একটি প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হচ্ছে।

সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও মতপার্থক্য থাকলেও সংসদের ভেতরে আইন প্রণয়ন, প্রশ্নোত্তর, বাজেট আলোচনা, সংসদীয় কমিটি এবং জনস্বার্থের বিভিন্ন ইস্যুতে অংশগ্রহণের একটি ধারা তৈরি হয়েছে।

প্রথম তিন অধিবেশনের পরিসংখ্যানও সংসদীয় কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দেখাচ্ছে। তবে শুধু কতটি বিল পাস হলো কিংবা কতটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো—সেটিই কার্যকর সংসদের একমাত্র মাপকাঠি নয়। সংসদ সরকারকে কতটা জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারছে, বিরোধী দল কতটা স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারছে এবং সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—সামনের দিনগুলোতে সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।

সংসদকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করার চেষ্টা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরু থেকেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতামূলক সংসদীয় চর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।

তৃতীয় অধিবেশনের শুরুতেও তিনি জাতীয় সংসদকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক মঞ্চ হিসেবে উল্লেখ করেন। আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি নিশ্চিত করাকে সংসদ সদস্যদের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশে সংসদ পরিচালনার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন স্পিকার।

এই অবস্থান কার্যকর হলে সংসদ কেবল আইন অনুমোদনের জায়গা না হয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ও জবাবদিহির মূল মঞ্চে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সরকার-বিরোধী দলের সম্পর্কেও ভিন্ন চিত্র

বর্তমান সংসদের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সংসদীয় সম্পর্ক।

সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্কের অবনতি হয়নি; বরং সংসদীয় কার্যক্রমে উভয় পক্ষের অংশগ্রহণ বেড়েছে। তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় কমিটি গঠনের সময়ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ দেখা গেছে।

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ রাখার কথা বলেছেন।

অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. মো. শফিকুর রহমানের দল নিজেদের অবস্থানকে ‘গঠনমূলক বিরোধিতা’ হিসেবে তুলে ধরছে—অর্থাৎ সরকারের সবকিছুর বিরোধিতা নয়, আবার নিঃশর্ত সমর্থনও নয়।

এই অবস্থানগুলো রাজনৈতিক ঘোষণা। এগুলো দীর্ঘ মেয়াদে সংসদীয় আচরণে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ।

কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ

সংসদকে কার্যকর করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

ত্রয়োদশ সংসদের ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২২টিতে তিনজন করে বিরোধীদলীয় সদস্য এবং বাকিগুলোতে দুজন করে বিরোধীদলীয় সদস্য রাখা হয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে দেওয়া।

সরকারি অর্থের ব্যবহার, মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তবে এখানেও মূল প্রশ্ন হবে—কমিটিগুলো শুধু সভা করবে, নাকি তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে বাস্তব পরিবর্তন আসবে।

প্রথম অধিবেশন: ২৫ কার্যদিবসে ৯৪ বিল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম নিয়মিত অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ এবং শেষ হয় ৩০ এপ্রিল। মোট ২৫ কার্যদিবসের এ অধিবেশনে ৯৪টি বিল পাস হয়।

পাশাপাশি পাঁচটি স্থায়ী এবং দুটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীকে উত্তর দেওয়ার জন্য ৯৩টি প্রশ্নের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৫টির উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য আসে ২ হাজার ৫০৯টি প্রশ্ন। এর মধ্যে উত্তর দেওয়া হয় ১ হাজার ৭৭৮টির।

কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ ধারায় গৃহীত ৩৮টি নোটিশের ওপর আলোচনা হয় এবং ৭১(ক) বিধিতে সংসদ সদস্যরা ২০৭ বার দুই মিনিটের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান।

এ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপরও দীর্ঘ আলোচনা হয়।

উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের সরকারি ওয়েবসাইটে ত্রয়োদশ সংসদের ‘Date of First Sitting’ হিসেবে ১৭ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে সংসদ সচিবালয়ের অধিবেশনসংক্রান্ত নথি ও অধিবেশন সমাপ্তির তথ্যে প্রথম নিয়মিত অধিবেশন ১২ মার্চ থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

বাজেট অধিবেশনে ৩১৬ এমপির অংশগ্রহণ

দ্বিতীয় অধিবেশন ছিল বর্তমান সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন। ৭ জুন শুরু হওয়া এ অধিবেশন ১৫ জুলাই পর্যন্ত চলে। সংসদের সরকারি তথ্যেও ৭ জুনের অধিবেশনকে ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় এবং প্রথম বাজেট অধিবেশন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২৬ কার্যদিবসের এই অধিবেশনে বাজেট নিয়ে ১৪ কার্যদিবসে প্রায় ৪৯ ঘণ্টা আলোচনা হয় এবং ৩১৬ জন সংসদ সদস্য এতে অংশ নেন।

এ অধিবেশনে সরকারি বিল পাস হয় ১০টি।

প্রধানমন্ত্রীর জন্য ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়ে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য জমা পড়ে ৫ হাজারের বেশি প্রশ্ন।

সংখ্যাগুলো দেখায়, সংসদ সদস্যরা প্রশ্নোত্তর ও বাজেট আলোচনার সুযোগ ব্যবহার করছেন। কিন্তু সেই প্রশ্নের মাধ্যমে সরকারের নীতি বা সিদ্ধান্তে কী পরিবর্তন এসেছে—কার্যকর সংসদ মূল্যায়নে সেই ফলাফলও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তৃতীয় অধিবেশনে মানবাধিকার ও গুমবিরোধী আইন

তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় ২৭ আগস্ট এবং শেষ হয় ১০ সেপ্টেম্বর। মোট নয়টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সংক্ষিপ্ত এই অধিবেশনে ছয়টি বিল পাস হয়।

এর মধ্যে ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬; সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬; স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬ এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬।

এই অধিবেশনেই ৩৫টি সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন এবং একটি বিশেষ কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দেন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেন।

সংখ্যা বলছে সক্রিয়তা, কিন্তু জবাবদিহি কতটা?

প্রথম তিন অধিবেশনের তথ্য একত্র করলে সংসদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়।

বিল পাস হয়েছে, হাজার হাজার প্রশ্ন জমা পড়েছে, মন্ত্রীরা উত্তর দিয়েছেন, বাজেট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে এবং স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে।

এগুলো সংসদীয় সক্রিয়তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

কিন্তু সংসদ কতটা কার্যকর—সেটি শুধু কার্যদিবস, বিল বা প্রশ্নের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারণ করা কঠিন।

একটি বিল পাস হওয়ার আগে কতটা পর্যালোচনা হয়েছে, বিরোধী দলের সংশোধনী কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর কতটা পূর্ণাঙ্গ, মন্ত্রীদের জবাবের পর কার্যকর ফলোআপ হয়েছে কি না এবং সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার কতটা সাড়া দিয়েছে—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিরোধিতা কি সংসদে থাকবে?

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা ছিল রাজনৈতিক বিরোধ সংসদের পরিবর্তে রাজপথে কেন্দ্রীভূত হওয়া।

বর্তমান বিরোধী দল সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদের বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচি অস্বাভাবিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সেই রাজনৈতিক বিরোধ যেন সংসদের ভেতরের বিতর্ক ও জবাবদিহির জায়গাটিকে প্রতিস্থাপন না করে।

সরকারি দলকেও নিশ্চিত করতে হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধী মতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে সমালোচনা, সংশোধনী ও ভিন্নমতের জন্য কার্যকর জায়গা রাখা হচ্ছে।

সামনে আসল পরীক্ষা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বয়স এখনো কম। তিনটি অধিবেশনের তথ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংসদীয় সংস্কৃতি স্থায়ীভাবে বদলে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।

তবে প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে—সরকার ও বিরোধী দলের সংসদীয় অংশগ্রহণ, প্রশ্নোত্তরের ব্যবহার, স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু সংসদে আলোচনার চেষ্টা।

এই ধারা টিকে থাকবে কি না, তার পরীক্ষা হবে রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে।

সরকারের জন্য অস্বস্তিকর কোনো প্রশ্ন উঠলে তা সংসদে আলোচনার সুযোগ পাবে কি না, মন্ত্রীরা কঠিন প্রশ্নের জবাব দেবেন কি না, বিরোধী দলের সমালোচনাকে কতটা গ্রহণ করা হবে, সংসদীয় কমিটি অনিয়ম বা ব্যর্থতা শনাক্ত করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এসবের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে সংসদ কতটা বদলেছে।

কারণ কার্যকর সংসদের পরিচয় শুধু কতটি আইন পাস হলো তাতে নয়; জনগণের হয়ে সরকারকে কতটা প্রশ্ন করা গেল, সেই প্রশ্নের কতটা জবাব পাওয়া গেল এবং সেই জবাব রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা পরিবর্তন আনল—তার মধ্যেই।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন