অনুমতি চেয়েও অপেক্ষায় ১৮ রপ্তানিকারক • বাংলাদেশের ইলিশ চেয়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের আবেদন • সময় ফুরিয়ে আসায় পশ্চিমবঙ্গের বাজারে অনিশ্চয়তা • এবার ভারত থেকেই বাংলাদেশে এসেছে পাঁচ শতাধিক টন ইলিশ
দুর্গাপূজার আগে পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশের ইলিশ—বছরের পর বছর ধরে এটি অনেকটাই পরিচিত দৃশ্য। সীমিত সময়ের বিশেষ অনুমতিতে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ যায় ভারতে, আর কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাড়ে ‘পদ্মার ইলিশ’-এর কদর। কিন্তু এবার সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে এসেও সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ থেকে ইলিশ নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন ভারতের ব্যবসায়ীরা, রপ্তানির অনুমতি চেয়েছে বাংলাদেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠানও। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিশেষ রপ্তানি অনুমোদন না আসায় দুর্গাপূজার বাজারে বাংলাদেশি ইলিশ পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ভারতের The Indian Express শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রতি বছর পূজার আগে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির যে বিশেষ সুযোগ পাওয়া যায়, এবার সেই অনুমোদনের অপেক্ষায় সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের মাছ ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দ্রুত সিদ্ধান্ত না এলে এবারের দুর্গাপূজায় বাংলাদেশের ইলিশ তাদের বাজারে পৌঁছাবে না।
ইলিশ চেয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা
বাংলাদেশের ইলিশ পেতে ভারতের ব্যবসায়ীদের আগ্রহ এবারও ছিল প্রবল।
ভারতের Fish Importers Association-এর একটি প্রতিনিধিদল গত আগস্টে ঢাকায় এসে বাংলাদেশের বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। দুর্গাপূজার আগে ভারতে ইলিশ পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানায় তারা।
পরে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতেও ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়ে যোগাযোগ করা হয়।
অন্যদিকে ভারতের বাজারে ইলিশ পাঠাতে বাংলাদেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে রপ্তানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করে।
এসব আবেদনের পর দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ ও চাহিদা পরিস্থিতি বিবেচনা করতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত চায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেই মতামতের ভিত্তিতেই রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না এবং দেওয়া হলে কী পরিমাণ ইলিশ পাঠানো যাবে—তা নির্ধারণের কথা ছিল।
তবে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে এসেও নতুন রপ্তানি কোটা ঘোষণার তথ্য পাওয়া যায়নি।
কলকাতায় অপেক্ষা, সময়ও ফুরিয়ে আসছে
ভারতের বাজারে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের ইলিশের আলাদা চাহিদা রয়েছে। দুর্গাপূজার সময় সেই চাহিদা আরও বেড়ে যায়।
The Indian Express-এর প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের Fish Importers Association-এর সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ২০ তারিখের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার পূজার জন্য ইলিশ রপ্তানির পরিমাণ ও সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়।
এবার সেই সময় পেরিয়ে গেছে।
বাংলাদেশে আগামী অক্টোবরের শুরুতে ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞার সময় ঘনিয়ে আসায় শেষ মুহূর্তে অনুমতি এলেও মাছ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও সীমান্ত পার করে পূজার বাজার ধরার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের হতাশার আরেকটি কারণ—বাংলাদেশের ইলিশ, বিশেষ করে পদ্মার ইলিশ পশ্চিমবঙ্গের বাজারে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন।
এবার ইলিশের যাত্রাপথই উল্টো
এ বছরের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনা অবশ্য অন্য জায়গায়।
সাধারণত পূজার আগে আলোচনা থাকে—বাংলাদেশ থেকে কত টন ইলিশ ভারতে যাবে। এবার সেই সময়েই ঘটেছে উল্টো ঘটনা।
ভারত থেকে পাঁচ শতাধিক টন ইলিশ বাংলাদেশে এসেছে। ভারতের The Indian Express-ও বিষয়টিকে দুই দেশের ইলিশ বাণিজ্যের ‘role reversal’ বা ভূমিকা বদলের ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে পাঁচ শতাধিক টন ভারতীয় ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। এসব মাছের উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতের গুজরাটের ভরুচ অঞ্চল থেকে এসেছে।
অর্থাৎ যে সময়ে কলকাতার ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের ইলিশের অপেক্ষায়, ঠিক সেই মৌসুমেই ভারতের ইলিশ বাংলাদেশের বাজারে ঢুকেছে।
তবে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির প্রবাহও বন্ধ হয়ে গেছে।
২০১৯ থেকে পূজায় ছিল বিশেষ সুযোগ
বাংলাদেশ ২০১২ সালে ইলিশ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের পর দীর্ঘ সময় নিয়মিত রপ্তানি বন্ধ ছিল। পরে ২০১৯ সাল থেকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ বিবেচনায় সীমিত সময়ের জন্য ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া শুরু হয়।
এরপর প্রায় প্রতিবছরই পূজার আগে কত টন ইলিশ ভারতে যাবে, তা নিয়ে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে আগ্রহ দেখা গেছে।
তবে অনুমোদিত পরিমাণ আর বাস্তবে রপ্তানি হওয়া ইলিশের পরিমাণ সবসময় এক ছিল না। কোনো কোনো বছর কয়েক হাজার টন রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার অনেক কম মাছ সীমান্ত পেরিয়েছে।
গত বছরও ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ভারতে যায় প্রায় ১৫০ টন।
কেন এবার অনুমোদন আসেনি?
এবার অনুমোদন না আসার সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
রপ্তানির আবেদন পাওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ ও চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছিল। ফলে দেশের বাজার পরিস্থিতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় ছিল।
তবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কোনো কারণ যুক্ত রয়েছে—এমন দাবি করার মতো আনুষ্ঠানিক তথ্য এখন পর্যন্ত নেই।
পদ্মার ইলিশের অপেক্ষায় পশ্চিমবঙ্গ
ইলিশ বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ—দুই বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পদ্মার ইলিশের স্বাদ ও পরিচিতির কারণে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের ইলিশের আলাদা বাজার রয়েছে।
সেই কারণে পূজার আগে বাংলাদেশ ইলিশ পাঠাবে কি না, বিষয়টি এখন ভারতের সংবাদমাধ্যমেও আলোচনায়।
The Indian Express-এর প্রতিবেদনে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট তাদের প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি, কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
এবার তাই দুর্গাপূজার আগে দুই দেশের ইলিশ বাণিজ্যে দেখা গেল ব্যতিক্রমী এক চিত্র, পদ্মার ইলিশের অপেক্ষায় পশ্চিমবঙ্গ, অথচ একই মৌসুমে ইলিশ এসেছে উল্টো পথে ভারত থেকে বাংলাদেশে।
শেষ মুহূর্তে রপ্তানির বিশেষ অনুমতি আসে কি না, এখন নজর সেদিকেই।

