৭০০-এর বেশি অতিথির অংশগ্রহণ • বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যয় • ইয়াও ওয়েন বললেন, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার পথ আরও বিস্তৃত হবে
গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় জমকালো সংবর্ধনার আয়োজন করেছে বাংলাদেশে চীনা দূতাবাস। একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন শেষে বিদায়ী চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে বিদায় সংবর্ধনাও দেওয়া হয়।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর হোটেল শেরাটনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সরকার, রাজনৈতিক দল, সামরিক বাহিনী, কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিসহ ৭০০-এর বেশি অতিথি অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাইনুর রহমান।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান ও জহির উদ্দিন স্বপনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, বাংলাদেশে কর্মরত চীনা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বাংলাদেশে বসবাসরত চীনা নাগরিক, গণমাধ্যম ও থিংকট্যাংকের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
‘বাংলাদেশ–চীন সহযোগিতার পথ আরও বিস্তৃত হবে’
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর গত ৭৭ বছরে দেশটি নিজস্ব জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিকায়নের একটি পথ অনুসরণ করেছে। বিশ্ব শান্তি ও উন্নয়নে চীন তার অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে অবদান রাখছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ–চীন সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ইয়াও ওয়েন বলেন, ২০২৬ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫১ বছর পূর্ণ হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতারও ১০ বছর পূর্তি হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ওই সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রযাত্রায় নতুন গতি যোগ করেছে। চীনা দূতাবাসের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ জুন বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সফরকালে দুই দেশের মধ্যে একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশে নিজের দায়িত্ব পালনের সময়ের স্মৃতিচারণ করে ইয়াও ওয়েন বলেন, এ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন কাছ থেকে দেখার পাশাপাশি বহু বাংলাদেশির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার সুযোগ হয়েছে তার। বাংলাদেশের মানুষের চীনের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব এবং তরুণদের আশাবাদ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে বলেও জানান তিনি।
দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে বিদায়ী রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ক্ষেত্র আগামী দিনে আরও বিস্তৃত ও গভীর হবে।
চীন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অংশীদার: মঈন খান
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান চীনকে বাংলাদেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। গত ৭৭ বছরে চীনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দেশটির অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে যোগাযোগ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে আগ্রহী উল্লেখ করে মঈন খান বলেন, এর মাধ্যমে দুই দেশের জনগণ যেন আরও বেশি সুফল পায়, সেটিই হওয়া উচিত সহযোগিতার অন্যতম লক্ষ্য।
বাংলাদেশ–চীন বন্ধুত্ব ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের ভূমিকারও প্রশংসা করেন তিনি।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় উৎসবের আমেজ
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে ছিল চীনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা আয়োজন। ‘কালারফুল ইউনান এথনিক কালচারাল এক্সচেঞ্জ ট্রুপ’, ইউনান মিনজু ইউনিভার্সিটির উশু দল এবং আনহুই নরমাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মিউজিকের নৃত্যশিল্পীরা বিভিন্ন পরিবেশনা উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানস্থলে চীনের উচ্চপ্রযুক্তি, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও পর্যটনকে তুলে ধরে বিশেষ প্রদর্শনী বুথও স্থাপন করা হয়। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে চীনের জাতীয় দিবসের সংবর্ধনা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে অনুষ্ঠানটি রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের বাংলাদেশে কূটনৈতিক দায়িত্বের শেষ পর্যায়ের একটি বিদায়ী আয়োজন হিসেবেও বিশেষ মাত্রা পায়। বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সরকার, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন।
চীনা দূতাবাসের সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। ২০২৬ সালে ইয়াও ওয়েন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র, অর্থ ও পরিকল্পনা, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতি এবং অন্যান্য খাতের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন।
রাষ্ট্রদূত পরিবর্তনের প্রাক্কালে আয়োজিত এই সংবর্ধনায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের বক্তব্যে বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশাই গুরুত্ব পেয়েছে।

