মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে না পারলে শান্তির দাবি অর্থহীন—ফরাসি প্রেসিডেন্ট • পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতার কড়া সমালোচনা • ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষায় বিশ্বকে নিষ্ক্রিয় না থাকার আহ্বান • দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে আবারও জোরালো অবস্থান
প্রান্তকাল ডেস্ক | নিউইয়র্ক, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গাজায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, গাজায় কথিত শান্তির যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, বাস্তবে তা যদি মানবিক সহায়তার পথও খুলতে না পারে, তবে সেই পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর জন্য লজ্জার হওয়া উচিত।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের এবারের ভাষণে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর বিশেষ গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হয়ে পড়া এবং শক্তির ভিত্তিতে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরির প্রবণতা নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। ফরাসি প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, জাতিসংঘের ভাষণে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনকে তাঁর কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
‘আমরা কি শুধু দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখব?’
গাজার পরিস্থিতি নিয়ে ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল কথিত শান্তির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা কূটনীতির সাফল্যের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে ম্যাক্রোঁ বলেন, কেউ কেউ একটি কথিত শান্তি নিয়ে গর্ব করছেন, কিন্তু সেই শান্তি মানবিক সহায়তা প্রবেশের পথও কার্যকরভাবে খুলতে পারেনি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন—“আমরা কি শুধু দাঁড়িয়ে এমন একটি দৃশ্য দেখব, যা আমাদের সবার জন্য লজ্জার হওয়া উচিত?”
ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে মূল প্রশ্নটি ছিল—মাঠের বাস্তবতায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ না কমলে শুধু রাজনৈতিকভাবে ‘শান্তি’ ঘোষণা কতটা অর্থবহ।
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ নয়
ম্যাক্রোঁ স্মরণ করিয়ে দেন, এক বছর আগে জাতিসংঘের একই মঞ্চে ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে স্বীকৃতির পরও বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল—ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু প্রতীকী কূটনৈতিক পদক্ষেপ হয়ে থাকলে চলবে না; সেটিকে কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রূপ দিতে হবে।
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা চলতি মাসেই যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান রক্ষায় আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন। তারা পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণকে সেই সমাধানের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
পশ্চিম তীর নিয়েও কঠোর ম্যাক্রোঁ
গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও কঠোর ভাষায় কথা বলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি এবং সহিংসতার কারণে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তব সম্ভাবনা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
ম্যাক্রোঁ বলেন, পশ্চিম তীরে প্রতিদিন যা ঘটছে, তা এমন একটি রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছে, যার ভিত্তি হওয়া উচিত ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্ব ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বৈধ অধিকারের প্রতি সম্মান।
তবে পশ্চিম তীরে হামাসের তৎপরতা নিয়ে ম্যাক্রোঁর ভাষণের একটি বক্তব্য পরে বিতর্ক তৈরি করে। ইসরায়েলি নেতারা তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করেন এবং ফরাসি একটি সূত্র জানায়, বক্তব্যটির ইংরেজি অনুবাদে বিভ্রান্তি হয়েছিল। ফলে ওই অংশটি নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যা ভিন্ন।
‘দায়মুক্তির নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ মেনে নেওয়া যায় না
শুধু গাজা নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ম্যাক্রোঁ।
তিনি সতর্ক করেন, বিশ্ব যেন আবার ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে না যায় এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র বা পক্ষগুলো যেন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেও দায়মুক্ত থাকতে না পারে।
মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করছে। এটিকে তিনি নতুন ধরনের বর্বরতার দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরেন।
দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানেই জোর
ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, ফ্রান্স ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক রাজনৈতিক সমাধানকে সামনে রেখে এগোতে চায়।
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা ৮ সেপ্টেম্বরের যৌথ ঘোষণায় বলেছে, নিরাপদ ইসরায়েলের পাশাপাশি নিরাপদ ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে দেশগুলো।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এবারের অধিবেশনে একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং পশ্চিম তীরে সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও বসতি সম্প্রসারণ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ সংকুচিত করছে।
শেষ জাতিসংঘ ভাষণে কঠোর বার্তা
বর্তমান মেয়াদে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটিই ম্যাক্রোঁর শেষ ভাষণ হওয়ার কথা। ফলে গাজা, পশ্চিম তীর, ইউক্রেন এবং আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে তাঁর বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তাঁর গাজা-বার্তার কেন্দ্রীয় প্রশ্নও ছিল স্পষ্ট—রাজনৈতিকভাবে শান্তির ঘোষণা দিলেই কি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, যদি গাজার সাধারণ মানুষের কাছে সেই শান্তির সুফল পৌঁছায় না?
ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে তাই শুধু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে এসেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের ভাষায়, গাজার মানুষের দুর্ভোগের সামনে বিশ্ব যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার—দুটিরই বাস্তব অর্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

