বাংলাদেশে ডিজেল ১৩৫ টাকা • পাকিস্তান ১৮৫, মিয়ানমার ১৬৫, নেপাল ১৬১ টাকা • যুক্তরাষ্ট্রে ২০৫, কানাডায় ২২৩ টাকা • মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বেড়েছে আমদানি, বীমা ও জাহাজভাড়া • ভর্তুকি ও পাচারের ঝুঁকিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ বলছে সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রান্তকাল
এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর বাংলাদেশে ডিজেলের দাম এখন ১৩৫ টাকা। মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন, কৃষি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার উদ্বেগ তৈরি হলেও তুলনামূলক আন্তর্জাতিক তথ্য বলছে, এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ এবং উন্নত অর্থনীতির অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের খুচরা দাম এখনো কম।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বীমা প্রিমিয়াম ও জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানকে মূল্য সমন্বয়ের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে সরকার।
এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে কম
প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা ধরে বাংলাদেশের নতুন ১৩৫ টাকা ডিজেলের দাম প্রায় ১ দশমিক ০৯২ মার্কিন ডলার প্রতি লিটার।
তুলনামূলক হিসাবে পাকিস্তানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা। মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, ফিলিপাইনে প্রায় ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা এবং ভিয়েতনামে প্রায় ১৩৭ টাকা।
সরকারের পক্ষ থেকেও প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে এ ধরনের তুলনা তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ২১ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানান, বাংলাদেশি মুদ্রায় কলকাতায় ডিজেল প্রায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং দুবাইয়ে প্রায় ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সব দেশের জ্বালানি বাজার, করকাঠামো, ভর্তুকি, মুদ্রার বিনিময় হার ও মানুষের আয় এক নয়। ফলে শুধু স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরিত লিটারপ্রতি দাম দিয়ে জ্বালানির প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার চাপ পুরোপুরি তুলনা করা যায় না।
উন্নত দেশে ব্যবধান আরও বেশি
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অনেক উন্নত অর্থনীতিতে ডিজেলের খুচরা মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তুলনামূলক তথ্যে হংকংয়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৮০ টাকা ৫৪ পয়সা, জার্মানিতে ৩৪৭ টাকা ৮৩ পয়সা, ফ্রান্সে ৩২৯ টাকা ৪০ পয়সা, যুক্তরাজ্যে ৩১৭ টাকা ৭৮ পয়সা এবং সুইডেনে প্রায় ২৯১ টাকা ৩২ পয়সা।
কানাডায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম প্রায় ২২২ টাকা ৬৯ পয়সা এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০৫ টাকা ২৬ পয়সা।
এই হিসাবে বাংলাদেশের ১৩৫ টাকার তুলনায় কানাডায় প্রতি লিটার প্রায় ৮৭ টাকা ৬৯ পয়সা এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭০ টাকা ২৬ পয়সা বেশি।
তবে আন্তর্জাতিক গড়ের সঙ্গে তুলনায় সতর্কতা
আন্তর্জাতিক জ্বালানি মূল্যের তথ্য সরবরাহকারী GlobalPetrolPrices-এর ১৪ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ সাপ্তাহিক তথ্যে বাংলাদেশের ডিজেলের দাম তখনকার ১১৫ টাকা বা ০.৯৪ ডলার প্রতি লিটার হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বে ডিজেলের গড় মূল্য ছিল প্রায় ১.৬২ ডলার প্রতি লিটার।
২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে দাম বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করার পরও একই বিনিময় হার ধরে তা প্রায় ১.০৯ ডলারের সমান হয়, যা ওই ১৪ সেপ্টেম্বরের বৈশ্বিক গড়ের নিচে।
তবে দুটি তথ্য একই দিনের নয়। তাই এটি বর্তমান বাংলাদেশের দাম বনাম ১৪ সেপ্টেম্বরের আন্তর্জাতিক গড়ের একটি তুলনামূলক হিসাব—একই দিনের বাজারদরের সরাসরি তুলনা নয়।
কেন ২০ টাকা বাড়াল সরকার
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বীমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন মার্চ থেকে আগস্ট—ছয় মাসে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার লোকসান করেছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় করা হলে ডিজেলের দাম লিটারে প্রায় ২০৫ টাকা হওয়ার কথা ছিল। সরকার তা না করে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে এবং বাকি ব্যবধানের একটি অংশ এখনো বহন করছে।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছিল। এই চাপ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন, যাতে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো অব্যাহত রাখা যায়।
পাচারের ঝুঁকির কথাও বলছে সরকার
মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি কারণ হিসেবে সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছেন প্রতিমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্য, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে জ্বালানি আমদানি করার পর প্রতিবেশী দেশের তুলনায় দেশে দাম কম থাকলে সীমান্ত দিয়ে তা পাচারের অর্থনৈতিক প্রণোদনা তৈরি হয়। এই ঝুঁকি কমাতেও মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে বলে সরকারের দাবি।
দাম বাড়ার সুযোগে ভাড়া বৃদ্ধিতে নজরদারি
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পরিবহন ও পণ্য পরিবহন ব্যয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার বলছে, মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোনো পক্ষ যাতে পরিবহন ভাড়া বা পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়াতে না পারে, সে জন্য বাজার তদারকি জোরদার করা হবে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ, ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত এর একটি অংশ ভোক্তার ওপর পড়তে পারে। শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা কর্মসংস্থান ও ব্যবসার ওপরও সম্ভাব্য চাপের কথা বলেছেন।
ফলে আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের দাম অনেক দেশের চেয়ে কম হলেও দেশের ভোক্তার জন্য মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত চাপ নির্ভর করবে আয়, পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং এর ফলে অন্যান্য পণ্যের দাম কতটা পরিবর্তিত হয়—সেসব বিষয়ের ওপর।

