জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা • ডিজেলে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা বলে দাবি • দৈনিক লোকসান ১০৯ কোটি টাকা • লিটারে ২০ টাকা বাড়ালে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান কমবে বলে হিসাব সরকারের
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে অসন্তোষের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সরকার জেনে-বুঝে জনগণকে অসন্তুষ্ট করবে—এমন কোনো কারণ নেই। জ্বালানি খাতে বিপুল ভর্তুকি ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ক্রমবর্ধমান লোকসানের প্রেক্ষাপটেই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় ডিজেল বিক্রিতে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এতে প্রতিদিন বিপিসির লোকসান হচ্ছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা।
এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়তে হবে বলে জানান তিনি।
২০ টাকা বাড়ালে লোকসান কমবে ১০ হাজার কোটি
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পেছনের আর্থিক হিসাব তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিপিসির সম্ভাব্য লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দাম বাড়ানোর পরও বিপিসির লোকসান পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না; বরং লোকসানের একটি অংশ কমানো হচ্ছে।
জ্বালানি খাতে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি অব্যাহত রাখা সরকারের জন্য কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
উপদেষ্টার বক্তব্যের সারকথা ছিল—একদিকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ, অন্যদিকে দেশে তুলনামূলক কম দামে বিক্রির ব্যবধান সরকারকে ভর্তুকির মাধ্যমে বহন করতে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আর্থিক চাপ সামাল দিতেই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
‘জনগণের একটু সহানুভূতিশীল হওয়া দরকার’
মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, সেই প্রসঙ্গেও কথা বলেন জাহেদ উর রহমান।
সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “এই সরকারের জেনে-বুঝে জনগণকে অসন্তুষ্ট করার তো কোনো কারণ নেই।”
একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষে কতটা ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। জনগণকে সরকারের পরিস্থিতির প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল হওয়ার অনুরোধও করেন।
এর আগেও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেছিলেন, জনগণের সংকটের প্রতি সরকার সমব্যথী। তবে একই সঙ্গে বর্তমান সংকটকে বহু বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যার ফল হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন তিনি।
জ্বালানি ব্যয় নিয়ে আগেও সতর্ক করেছে সরকার
গত ২৫ আগস্টের আরেকটি ব্রিফিংয়ে জাহেদ উর রহমান জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের একই সময়ে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ১২ থেকে ১৪ ডলারের মধ্যে থাকলেও আগস্টের শেষ দিকে তা প্রায় ২৪ ডলারে পৌঁছেছিল।
তখনও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—অতিরিক্ত দামে গ্যাস আমদানি করে বিপুল ভর্তুকি দেওয়া হবে, নাকি স্বল্প সময়ের জন্য কিছুটা লোডশেডিং মেনে নেওয়া হবে। জ্বালানি সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেছিলেন।
সরকারের পক্ষ থেকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপন, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা এবং গ্যাসকূপ খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনার কথাও আগে জানানো হয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এখন মূল প্রশ্ন ভর্তুকি
মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে সরকারের প্রধান যুক্তি হিসেবে বিপিসির লোকসান ও ভর্তুকির চাপই উঠে এসেছে।
সরকারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ডিজেলে বর্তমান লোকসানের পুরোটা ভোক্তার ওপর চাপানো হয়নি। লিটারে ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে লোকসানের একটি অংশ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে কী প্রভাব পড়বে—মঙ্গলবারের প্রকাশিত বক্তব্যে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিমাণগত হিসাব দেননি উপদেষ্টা।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগের মধ্যে সরকারের বার্তা হচ্ছে—সিদ্ধান্তটি জনগণকে অসন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং বিপুল ভর্তুকি ও জ্বালানি খাতের আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার অংশ হিসেবেই নেওয়া হয়েছে।

