বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিত্যপণ্যের চাপে এবার দুধ, লিটারে বাড়ল ১০ টাকা

প্রায় সব বড় ব্র্যান্ডেই মূল্যবৃদ্ধি • এক লিটার ১১০–১১৫ টাকা • আধা লিটার ৫৫–৬০ টাকা • উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলছে কোম্পানিগুলো • সংসারের বাজেটে নতুন চাপের আশঙ্কা

ভোজ্যতেল, ডিম, মুরগি ও সবজিসহ নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপ সামলাতে থাকা ভোক্তার জন্য এবার বাড়ল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের দাম। বাজারে প্রায় সব পরিচিত ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে এক লিটার দুধ কিনতে এখন গুনতে হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকা।

নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর আধা লিটারের প্যাকেটও বেড়ে হয়েছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ও পরিবারের নিয়মিত পুষ্টির চাহিদায় দুধ ব্যবহারকারী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের মাসিক খাদ্যব্যয়ে এই মূল্যবৃদ্ধি নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ফার্ম ফ্রেশ, আড়ং ও প্রাণসহ বড় বেসরকারি ডেইরি ব্র্যান্ডের এক লিটার তরল দুধ এখন ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আধা লিটারের প্যাকেটের দাম প্রায় ৫৫ টাকা। এর আগে এসব পণ্যের এক লিটারের দাম সাধারণত ১০০ থেকে ১০৫ টাকার মধ্যে ছিল।

পথ দেখায় মিল্কভিটার মূল্যবৃদ্ধি

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগেই রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন—মিল্কভিটা—তরল দুধের দাম বাড়ায়।

গত ১ আগস্ট থেকে মিল্কভিটার এক লিটার পাস্তুরিত দুধের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১০ টাকা করা হয়। ৫০০ মিলিলিটারের স্ট্যান্ডার্ড দুধের দাম ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং ২৫০ মিলিলিটারের প্যাকেটের দাম ২৮ থেকে ৩৩ টাকা করা হয়।

মিল্কভিটার মূল্যবৃদ্ধির প্রায় দেড় মাসের মধ্যে বেসরকারি কোম্পানিগুলোও একই পথে হাঁটল। ফলে বাজারে এখন সরকারি ও বেসরকারি—দুই ধরনের ব্র্যান্ডের তরল দুধেই বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে ক্রেতাকে।

কেন বাড়ছে দাম

দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য, শুধু কাঁচা দুধের দাম নয়—পুরো সরবরাহ ও উৎপাদনব্যবস্থায় ব্যয় বেড়েছে।

গোখাদ্য, খামার থেকে দুধ সংগ্রহ, সংগ্রাহকদের মজুরি, প্যাকেজিং উপকরণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধিকে মূল্য সমন্বয়ের কারণ হিসেবে তুলে ধরছে প্রতিষ্ঠানগুলো। মিল্কভিটা এর আগে জানিয়েছিল, প্রতি লিটার দুধ উৎপাদনে তাদের ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় ১১ থেকে সাড়ে ১১ টাকা বেড়েছে।

একই সঙ্গে খামারিদের কাছ থেকে দুধ কেনার দামও বাড়িয়েছে মিল্কভিটা। ন্যূনতম ৪ শতাংশ ফ্যাটযুক্ত প্রতি লিটার দুধের সংগ্রহমূল্য ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৩ টাকা করা হয়েছে।

দাম বাড়লেও ভোক্তার প্রশ্ন

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি থাকলেও প্রায় একই সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সেক্রেটারি হুমায়ুন কবির ভূঁইয়ার মতে, অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম আগে থেকেই বেশি থাকায় তরল দুধের নতুন মূল্যবৃদ্ধি পরিবারের বাজেটে আরও চাপ তৈরি করবে। দুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিপণ্যের মূল্য সমন্বয় আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।

খুচরা বিক্রেতাদের একাংশও বলছেন, দাম বাড়ার পর তরল দুধের বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারে নিয়মিত দুধ কেনার পরিমাণ কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

শিশুদের পুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ

দুধ শুধু একটি সাধারণ খাদ্যপণ্য নয়; শিশুদের খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, ক্যালসিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির একটি প্রচলিত উৎস। ফলে দামের পরিবর্তন সরাসরি পারিবারিক খাদ্যব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশেষ করে যেসব পরিবার প্রতিদিন এক লিটার প্যাকেটজাত দুধ কেনে, লিটারে ১০ টাকা বৃদ্ধির হিসাবে তাদের মাসে শুধু দুধের পেছনেই প্রায় ৩০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে।

আর দিনে দুই লিটার ব্যবহারকারী পরিবারের ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৬০০ টাকা মাসে।

একের পর এক নিত্যপণ্যে চাপ

দুধের দাম এমন সময়ে বাড়ল, যখন বাজারে আরও কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সেপ্টেম্বরের শুরুতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সাম্প্রতিক বাজারে ফার্মের মুরগির ডিম ডজনপ্রতি প্রায় ১৫০–১৫৫ টাকা এবং বিভিন্ন সবজির দামও তুলনামূলক উঁচু রয়েছে।

ফলে আলাদাভাবে দুধের দাম ১০ টাকা বৃদ্ধি খুব বড় অঙ্ক মনে না হলেও খাদ্যঝুড়ির একাধিক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি একসঙ্গে বিবেচনা করলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের ওপর সামগ্রিক চাপ আরও বাড়ছে।

এ অবস্থায় উৎপাদন ব্যয়ের প্রকৃত পরিবর্তন, খামারির ন্যায্য মূল্য এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা—তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রেখে প্যাকেটজাত দুধের বাজারে মূল্য নির্ধারণ ও তদারকির বিষয়টি সামনে এসেছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন