বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাশিয়া-ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে মার্কিন কংগ্রেসের বড় পদক্ষেপ

রুশ তেল কিনলেই ১০০% পর্যন্ত শুল্কের ঝুঁকি, ট্রাম্পের হাতে নতুন ক্ষমতা

২৬২-১৫৯ ভোটে প্রতিনিধি পরিষদে বিল পাস • সিনেটেও আগেই ৮৬-১১ ভোটে অনুমোদন • লক্ষ্য রাশিয়ার জ্বালানি-প্রতিরক্ষা খাত ও ‘শ্যাডো ফ্লিট’ • রুশ তেল-গ্যাসের বড় ক্রেতা ভারত-চীনের ওপরও পড়তে পারে চাপ • ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানোর বিধান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থের উৎসে আঘাত এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পাস হয়েছে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের বিল। বুধবার প্রতিনিধি পরিষদে ২৬২-১৫৯ ভোটে অনুমোদন পাওয়া ‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’ এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের অপেক্ষায়। সিনেটে বিলটি গত মাসেই ৮৬-১১ ভোটে পাস হয়েছিল। 

বিলটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শুধু রাশিয়ার ব্যক্তি, ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন, ভারতসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতাও প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হচ্ছে। তবে এই ক্ষমতা থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হচ্ছে না; বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও আইনের শর্তের ওপর। 

নিশানায় রাশিয়ার অর্থের উৎস

আইনটির প্রধান লক্ষ্য রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্প। পাশাপাশি বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রুশ তেল পরিবহনে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া ট্যাংকার বহরও এর আওতায় পড়বে। সমর্থকদের যুক্তি, এসব খাত থেকে মস্কোর আয় কমাতে পারলে ইউক্রেন যুদ্ধ পরিচালনায় রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়বে। 

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর মস্কোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো একাধিক দফা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। নতুন বিলটি আইনে পরিণত হলে সেই চাপের পরিধি আরও বাড়বে এবং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য করা তৃতীয় দেশগুলোর ওপরও মার্কিন শুল্ক ব্যবহারের আইনি সুযোগ তৈরি হবে। 

ভারত-চীনের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিলটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে মূলত এই ‘সেকেন্ডারি’ চাপের কারণে। রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতাদের মধ্যে ভারত ও চীন রয়েছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন ক্ষমতা প্রয়োগ করলে এই দুই দেশের মার্কিন বাজারমুখী পণ্যে বড় ধরনের অতিরিক্ত শুল্কের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। 

তবে ‘ভারত বা চীনের ওপর এখনই ১০০ শতাংশ শুল্ক বসে গেছে’ এমনটি নয়। বিলটি ট্রাম্পকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিচ্ছে। কোন দেশের বিরুদ্ধে কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

ইরানও একই আইনের আওতায়

বিলটির নামেই রাশিয়ার পাশাপাশি ইরানকে রাখা হয়েছে। এতে ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণ বা মেয়াদ বাড়ানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। এমন এক সময়ে এই পদক্ষেপ এলো, যখন ওয়াশিংটন তেহরানের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও রাজস্বের পথ সংকুচিত করতে আলাদাভাবেও তৎপরতা বাড়িয়েছে। 

বুধবারই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের Financial Crimes Enforcement Network বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেছে। মার্কিন ট্রেজারির ভাষ্য অনুযায়ী, ‘Operation Economic Outcast’-এর আওতায় ইরানের রাজস্ব ও ক্রয় নেটওয়ার্কে অর্থপ্রবাহ ব্যাহত করাই এর উদ্দেশ্য। 

নিজ দলেও ছিল আপত্তি

বিলটি প্রতিনিধি পরিষদে দ্বিদলীয় সমর্থন পেলেও ভোটের চিত্রে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট। Reuters জানিয়েছে, ৫৮ জন ডেমোক্র্যাট দলীয় নেতৃত্বের অবস্থানের বাইরে গিয়ে বিলের পক্ষে ভোট দেন; বিপরীতে সাতজন রিপাবলিকান এর বিরোধিতা করেন। 

আপত্তির বড় জায়গা ছিল প্রেসিডেন্টের হাতে শুল্ক আরোপের বিস্তৃত ক্ষমতা। বিরোধীদের আশঙ্কা, এই ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবহার করা হতে পারে এবং অতিরিক্ত শুল্ক শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদের ওপর মূল্যচাপ বাড়াতে পারে। ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিসের অভিযোগ, বিলে এমন ছাড়ের সুযোগও রয়েছে যার ফলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে প্রয়োগ না-ও হতে পারে। 

গ্রাহামের মৃত্যুর পর তাঁর নামেই বিল

রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম কয়েক ডজন সিনেটরকে সঙ্গে নিয়ে ২০২৫ সালের এপ্রিলে উদ্যোগটি সামনে এনেছিলেন। ২০২৬ সালের ১১ জুলাই তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর সম্মানে বিলটির নাম রাখা হয় ‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’। 

সিনেটে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সরাসরি তৎপরতার পর বিলটি ৮৬-১১ ভোটে অনুমোদিত হয়। প্রতিনিধি পরিষদে অনুমোদনের মধ্য দিয়ে এখন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের বাধা পার হলো আইনটি। 

এখন সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের

বিলটি এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টেবিলে। স্বাক্ষর করলে এটি আইনে পরিণত হবে। এরপর নজর থাকবে দুটি বিষয়ে—রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং রুশ জ্বালানির বড় ক্রেতাদের ক্ষেত্রে ট্রাম্প সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ব্যবহার করেন কি না।

বিশেষ করে ভারত ও চীনের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার প্রয়োগ বিশ্ববাণিজ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বিলটির সমর্থকদের প্রত্যাশা, রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের ওপর বাড়তি চাপ মস্কোকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় আনতে সহায়ক হবে—এটি তাদের রাজনৈতিক যুক্তি, নিশ্চিত ফল নয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন