অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপের আশঙ্কা, সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যানে যাচ্ছে সরকার

শুধু পরিকল্পনা নয়, মাঠে কার্যকর বাস্তবায়নের তাগিদ স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর • স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ • বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নগর জনস্বাস্থ্য প্রকল্পে ভেক্টর ব্যবস্থাপনা ও পূর্বাভাস সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ

দেশে ডেঙ্গুর চলমান পরিস্থিতির মধ্যে সামনে আরও বড় ঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একটি পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী আগামী অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে সীমাবদ্ধ না থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে সরকার। 

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘Strategic Action Planning for Dengue Prevention’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব বিষয় উঠে আসে। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন ‘Improvement of Urban Public Health Preventive Services Project (IUPHPSP)’ কর্মশালাটির আয়োজন করে। প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অপারেশনস অফিসার ও প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার ইফ্ফাত মাহমুদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। 

‘অ্যাকশন প্ল্যান করলেই হবে না’

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি সেটি বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে রোগের বিস্তার ঠেকাতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। 

ড. মঈন খান বলেন, ডেঙ্গু নতুন কোনো রোগ নয়; দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এ রোগের উপস্থিতি রয়েছে। তাই অতীত অভিজ্ঞতা, পরিবেশগত পরিবর্তন ও মশার বিস্তারের ধরন বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানোর তাগিদ দেন তিনি। 

মন্ত্রী জনসচেতনতার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু সরকারি সংস্থার কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল না রেখে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। 

অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার পূর্বাভাস

কর্মশালায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মেডিকেল এনটোমোলজিস্ট ড. কবিরুল বাশার ডেঙ্গুর সামনের দিনের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন। তিনি জানান, তাদের পূর্বাভাস মডেলে অক্টোবরে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও অবনতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। 

এই পূর্বাভাস এমন সময়ে সামনে এলো, যখন সরকার ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বিস্তারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। 

মশার ওষুধ নিয়েও গবেষণায় জোর

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত মশার ওষুধ কতটা কার্যকর, সেটিও সরকারের নজরে এসেছে। গত ৩০ আগস্ট ডেঙ্গু প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, মশার লার্ভার উৎস ধ্বংসের পাশাপাশি মশা নিধনে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা বাড়াতে গবেষণা ও কারিগরি সক্ষমতা শক্তিশালী করা হচ্ছে। 

ফলে সরকারের বর্তমান কৌশলে শুধু ফগিং বা মশা নিধনের প্রচলিত কার্যক্রম নয়, ভেক্টর ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, পূর্বাভাস, প্রযুক্তি এবং জনসচেতনতাকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১,১৮১ কোটি টাকার প্রকল্প

ডেঙ্গুসহ নগর জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে বাস্তবায়িত IUPHPSP প্রকল্পের মোট ব্যয় ১ হাজার ১৮১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ ঋণ ১ হাজার ৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং সরকারের অর্থায়ন ১০৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৮ পর্যন্ত। 

প্রকল্পটির উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে নগর জনস্বাস্থ্যের প্রতিরোধমূলক সেবা শক্তিশালী করা। এর আওতায় ভেক্টর ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো, মানুষের আচরণগত পরিবর্তনে যোগাযোগ কার্যক্রম এবং অসংক্রামক রোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ রয়েছে। 

সরকারি নথি অনুযায়ী, এ উদ্যোগের মাধ্যমে ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বছরজুড়ে ভেক্টর নিয়ে গবেষণা, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস এবং একটি বিশেষায়িত গবেষণাগার গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে। 

সামনে বড় পরীক্ষা বাস্তবায়নে

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিগত বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে সামনে মৃত্যু যাতে না বাড়ে, সে জন্য এখন থেকেই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। 

বিশেষজ্ঞদের অক্টোবরে পরিস্থিতি অবনতির পূর্বাভাসের পর সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পরিকল্পনাকে দ্রুত মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা, কার্যকর ভেক্টর ব্যবস্থাপনা, রোগের আগাম পূর্বাভাস এবং নাগরিকদের সম্পৃক্ততা—এসব কার্যক্রম কতটা সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার ওপর আগামী মাসগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে। 


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন