বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের সংকট নিয়ে তিন ঘণ্টার বৈঠক • ২১ ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ • উৎপাদন বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরল সরকার
চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প-কারখানার উৎপাদনে তৈরি হওয়া চাপ কমাতে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে এ তথ্য জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ ও এমসিসিআইসহ ২১টি ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বও সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক সাংবাদিকদের বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি শিল্প খাতও ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ী নেতাদের জানিয়েছেন, বর্তমান সংকট তীব্র হওয়ার আগের পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। মঙ্গলবার রাত থেকেই পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
ফজলুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা। শিল্পের সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা কীভাবে পূরণ করা হবে, সে বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা বৈঠকে তুলে ধরা হয়।
জ্বালানি সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সরকার এরই মধ্যে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সাইসমিক জরিপ, বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট ও নতুন বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণকে সামনে রেখে পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিনও সোমবার জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে এবং বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর অংশ হিসেবে এলএনজি আমদানি সক্ষমতা সম্প্রসারণেও সরকার এগোচ্ছে। তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ২০২৮ সালের আগেই চালুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা দৈনিক ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্তমান সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কৌশলগত কাঠামোয় সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটে নেওয়া, নতুন এলএনজি অবকাঠামো, দেশীয় গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার বড় ধরনের উন্নয়নের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে বছরে ১৫০ থেকে ১৮০ কোটি ডলারের ক্যাপাসিটি পেমেন্টের চাপ কমানোর বিষয়টিও সামনে রাখা হয়েছে।
এর একদিন আগে রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শেভরনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠকেও বাংলাদেশের বিদ্যমান ও পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন গ্যাসের মজুত অনুসন্ধানে বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
সোমবারের বৈঠকে ব্যবসায়ীদের সামনে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরার পর এখন তাৎক্ষণিকভাবে নজর থাকবে মঙ্গলবার রাত থেকে শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কতটা বাড়ে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা ও ব্যয় কমানো এবং শিল্পের ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকছে।

