বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

পুলিশের সাবেক ডিসি ইকবাল, বিপ্লব সরকারসহ ৬ কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ‘গুলি করি, মরে একটা, বাকিডি যায় না’ বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আসা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইনসহ ছয় পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার।

বুধবার (১২ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী এ ধরনের অনুপস্থিতিকে ‘পলায়ন’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

চাকরিচ্যুত অন্য কর্মকর্তারা হলেন—ডিএমপির উত্তরা বিভাগের সাবেক উপকমিশনার কাজী আশরাফুল আজীম, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. গোলাম রুহানী এবং কক্সবাজারের উখিয়ায় ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যেদিন থেকে অনুপস্থিতি শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই তাঁদের চাকরিচ্যুতি কার্যকর করা হয়েছে। কাজী আশরাফুল আজীম ও রাজন কুমার দাসের বিরুদ্ধে ‘পলায়নের’ পাশাপাশি ‘অসদাচরণের’ অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে।

ইকবাল হোসাইনের চাকরিচ্যুতি

প্রজ্ঞাপনে মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইনকে বর্তমানে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত পুলিশ সুপার এবং ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইকবাল হোসাইন ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তাঁর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানায় এবং ই-মেইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি।

এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি লিখিত জবাব দেননি এবং সময় বৃদ্ধির আবেদনও করেননি। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগ তদন্ত করে ‘পলায়নের’ অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেন।

তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার পর তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। পরে সরকারি কর্ম কমিশনের মতামত ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট থেকে তাঁর চাকরিচ্যুতি কার্যকর করা হয়।

এর আগে একই অভিযোগে গত বছরের ২৩ জুলাই ইকবাল হোসাইনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল সরকার। এক বছরের বেশি সময় পর তাঁকে এবার চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হলো।

যে বক্তব্যে আলোচনায় আসেন ইকবাল

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে হতাহতের ঘটনা নিয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে পরিস্থিতি জানাচ্ছিলেন ইকবাল হোসাইন। সে সময়ের ৪৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়।

ভিডিওতে ইকবাল হোসাইনকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না।’

ভিডিওতে তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর আলমকেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

তবে জুলাইয়ের আন্দোলন কিংবা ওই বক্তব্যকে ইকবাল হোসাইনের চাকরিচ্যুতির কারণ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়নি। বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

চাকরিচ্যুত অন্য পাঁচ কর্মকর্তা

কাজী আশরাফুল আজীম: ২০২৪ সালের ৪ জুলাই থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ছিলেন। বদলির আদেশের পর ১৪ আগস্ট তিনি ডিএমপির দায়িত্ব ছাড়লেও চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে যোগ দেননি। ওই দিন থেকেই তাঁর অনুপস্থিতি শুরু হয়। তদন্তে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়নের’ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৪ আগস্ট ২০২৪ থেকে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

বিপ্লব কুমার সরকার: ডিএমপির সাবেক এই যুগ্ম কমিশনার সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তিনি ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কর্তৃপক্ষকে মৌখিক বা লিখিতভাবে না জানিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। ওই তারিখ থেকেই তাঁর চাকরিচ্যুতি কার্যকর করা হয়েছে।

সুদীপ কুমার চক্রবর্তী: তিনিও সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার জন্য একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি কাজে ফেরেননি। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট থেকে অনুপস্থিত থাকায় ওই দিন থেকেই তাঁর চাকরিচ্যুতি কার্যকর করা হয়েছে।

রাজন কুমার দাস: কক্সবাজারের উখিয়ায় ৮ এপিবিএনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের ২৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি নিয়েছিলেন। ছুটি শেষে ৩১ ডিসেম্বর কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি আর ফেরেননি। তদন্তে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়নের’ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

মো. গোলাম রুহানী: ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার গোলাম রুহানী ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব হিসেবে প্রেষণে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ডিএমপির দায়িত্বভার ছাড়েন। পরে তাঁকে খাগড়াছড়ির এপিবিএন ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বদলি করা হলেও তিনি সেখানে যোগ দেননি। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট থেকে অনুপস্থিত থাকায় ওই দিন থেকেই তাঁর চাকরিচ্যুতি কার্যকর করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়া শেষে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন