বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত একটি খসড়া প্রস্তাবে ১১২টি দেশ সহ-উত্থাপক হিসেবে যুক্ত হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।
বাহরাইন ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে উত্থাপিত এ প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক জলপথ, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলা বন্ধের কথাও বলা হয়েছে।
কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েত এই প্রস্তাবের প্রধান সমর্থক হিসেবে যুক্ত হয়েছে। এছাড়া ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কেনিয়া, আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রও এতে সমর্থন দিয়েছে বলে জানিয়েছে কূটনৈতিক সূত্র।
নিউইয়র্কে আল জাজিরার প্রতিনিধি গ্যাব্রিয়েল এলিজন্দো বলেন, “সহ-উত্থাপক দেশের তালিকাটি তিন পৃষ্ঠাজুড়ে বিস্তৃত। জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এই প্রস্তাবকে সমর্থন করছে।”
এর আগে গত মাসেও বাহরাইন একই ধরনের একটি প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে তোলে। তবে সেটি চীন ও রাশিয়ার ভেটোতে আটকে যায়। নতুন প্রস্তাব নিয়েও বেইজিং ও মস্কো আপত্তি জানিয়েছে, যদিও তারা আবারও ভেটো দেবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শান্তি আলোচনা এখনও অচলাবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির দাবি তুলেছে।
ইরান আরও বলেছে, যেকোনো সমঝোতায় হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দিতে হবে। তবে ওয়াশিংটন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “অপমান, হুমকি ও জোরপূর্বক ছাড় আদায়ের ভাষা দিয়ে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।” তিনি বলেন, ইরানের দাবিগুলো কোনো ‘সর্বোচ্চ দাবি’ নয়, বরং “টেকসই সমঝোতার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা”।
এদিকে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মঙ্গলবার দোহা সফর করে কাতারের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, “হরমুজ প্রণালীকে কোনো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।”
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি নতুন করে যুদ্ধ শুরুর বিরুদ্ধে সতর্ক করে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়াকে সমর্থন করি না। পাকিস্তান যে ভূমিকা পালন করছে, তা পুরো অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
এই কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফরে গেছেন। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ইরান যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীন ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং দেশটির সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা হলেও এখন পর্যন্ত সংঘাতে সরাসরি জড়ায়নি। তবে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে বেইজিং।
তিন দিনের এই চীন সফরের আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “আমি আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ভাবি না। আমি শুধু একটি বিষয় নিয়েই ভাবি—ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না।”

