সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে বাংলাদেশের পাশে থাকবে এডিবি

উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে কাঠামোগত সংস্কার ও বেসরকারি বিনিয়োগে জোর

ঢাকা, ১৭ আগস্ট ২০২৬:

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করা এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

এডিবির দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়িংমিং ইয়াং বলেছেন, উৎপাদনশীল, বিনিয়োগনির্ভর ও সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে যাবে এডিবি। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ইয়িংমিং ইয়াং। গত ৯ থেকে ১৩ আগস্ট পাঁচ দিনের সফরে তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করেন। এ সময় সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের পরবর্তী কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি (CPS), গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, বিনিয়োগের অগ্রাধিকার এবং ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট (IGND) উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে নীতিগত আলোচনা করেন তিনি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে এডিবির সহযোগিতা

ইয়িংমিং ইয়াং বলেন, বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করাই এডিবির অন্যতম লক্ষ্য।

তার মতে, শক্তিশালী প্রবাসী আয়, সেবা খাতের ধারাবাহিক কার্যক্রম এবং গতিশীল বেসরকারি খাতের কারণে সাম্প্রতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। এখন এই সক্ষমতাকে আরও গভীর অর্থনৈতিক রূপান্তরের কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হওয়া, মূল্যস্ফীতি কমে আসা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ার ফলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আগামী দিনগুলোতে ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।

এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।

সংস্কারের ধারাবাহিকতা জরুরি

তবে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির এই গতি ধরে রাখতে কাঠামোগত সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট।

তিনি বলেন, কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ মোকাবিলা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো ইতিবাচক।

ইয়িংমিং ইয়াংয়ের মতে, এসব সংস্কারের সফল বাস্তবায়ন বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের আর্থিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করবে।

তিনি বলেন, অর্থনীতিকে কেবল বর্তমান সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের দিকে নিতে হবে।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে বেসরকারি খাতকে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন ইয়িংমিং ইয়াং।

তিনি বলেন, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি।

একই সঙ্গে নারী ও তরুণদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তার মতে, বাজারকে আরও বিনিয়োগবান্ধব করা গেলে বেসরকারি মূলধন উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হবে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ বাড়বে।

এই সংস্কারগুলোর সুফল হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আরও ভালো কর্মসংস্থান, প্রতিযোগিতামূলক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, উন্নত সেবা এবং দেশের প্রচলিত প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রের বাইরে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি

বাংলাদেশের জন্য এডিবির নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি (CPS) নিয়েও কথা বলেন ইয়িংমিং ইয়াং।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও উন্নয়ন লক্ষ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এডিবির অংশীদারত্বও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে।

নতুন কৌশলের আওতায় বাংলাদেশকে আরও বহুমুখী, প্রতিযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়েছে এডিবি।

বিশেষ করে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ এবং বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ইয়িংমিং ইয়াংয়ের ভাষায়, ভবিষ্যতের অংশীদারত্ব বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শুধু সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা থেকে প্রকৃত অর্থনৈতিক রূপান্তরের দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

পরিবহন ব্যয় কমাবে আইজিএনডি

ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট (IGND) উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ সংযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট।

তিনি বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় কমানো, বড় শহরের বাইরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ এবং ব্যবসা ও শ্রমবাজারকে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

এর ফলে দেশের অর্থনীতি আরও প্রতিযোগিতামূলক, বহুমুখী ও সহনশীল হয়ে উঠবে এবং উচ্চমানের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান ধরে রাখা সহজ হবে।

একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবৃদ্ধির সুফল আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের বড় সম্পদ

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহৎ ও দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলোর মধ্যবর্তী অবস্থান বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা বলে মনে করেন ইয়িংমিং ইয়াং।

এই অবস্থান কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত হওয়া এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ পেতে পারে।

এর আগে গত মে মাসে বাংলাদেশ সফরের সময় এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দাও বাংলাদেশকে পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন।

শুধু অবকাঠামো নয়, নীতিগত সংস্কারও জরুরি

বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু সড়ক, রেলপথ ও বন্দর নির্মাণ যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইয়িংমিং ইয়াং।

তার মতে, সড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, সীমান্ত অবকাঠামো ও জ্বালানি সংযোগের সঙ্গে দক্ষ শুল্কব্যবস্থা, সমন্বিত মানদণ্ড, পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং নির্বিঘ্ন সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতিগত সমন্বয় একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। তবেই অবকাঠামো বিনিয়োগের পূর্ণ অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।

আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ

ডিজিটাল সংযোগ বাড়াতেও এডিবি বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায় বলে জানান ইয়িংমিং ইয়াং।

সম্প্রতি চালু হওয়া এডিবির ২০ বিলিয়ন ডলারের এশিয়া-প্যাসিফিক ডিজিটাল হাইওয়ে উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য নির্ভরযোগ্য ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো সম্প্রসারণ, ডিজিটাল সংযোগ বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষক, উদ্যোক্তা, রপ্তানিকারক, তরুণ কর্মী এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বাড়তে পারে।

তার মতে, আইজিএনডি ও দক্ষিণ এশিয়া উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাসেক) উদ্যোগও বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক একীভূতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিকল্প নয় আঞ্চলিক সংযোগ

তবে আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের বিকল্প হিসেবে দেখছেন না এডিবির এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, বরং আঞ্চলিক সংযোগ দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা যত বাড়বে, দেশ তত ভালোভাবে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে।

একই সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি পেলে বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও সংস্কারের জন্য আরও শক্তিশালী প্রণোদনা তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।

‘সহনশীলতা থেকে রূপান্তরের পথে বাংলাদেশ’

এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্টের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু বিদ্যমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ নয়; বরং সেই স্থিতিশীলতাকে উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরে পরিণত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তার মতে, বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, আঞ্চলিক সংযোগ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন—এই বিষয়গুলোর সমন্বিত বাস্তবায়নই বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়ন পর্যায়ের মূল চালিকাশক্তি হতে পারে।

এডিবির সহযোগিতায় এসব সংস্কার ও বিনিয়োগ অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন