শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

ইরান যুদ্ধের অভিঘাত: বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণ, চাপে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানকে ঘিরে ৪০ দিনের যুদ্ধের সামরিক অধ্যায় শেষ হলেও এর রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অভিঘাত এখনো থামেনি। পশ্চিম এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এই সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতির শক্তির ভারসাম্য, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি নেতৃত্বের প্রত্যাশা ছিল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে বড় ধরনের আঘাত দিয়ে দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল করা সম্ভব হবে। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি—এমনটাই দাবি করা হয়েছে ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বিভিন্ন ধারায়।

নিওকনজারভেটিভ বিশ্লেষক রবার্ট কাগান সংঘাতের শুরুতেই সতর্ক করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের ক্ষতি হলে তা শুধু ওয়াশিংটনের জন্য সামরিক ব্যর্থতা হবে না; এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে মার্কিন মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের আচরণেও পড়তে পারে।

যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সেই সম্ভাবনাই।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ

ইরান যুদ্ধের প্রভাব মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর জনপ্রিয়তার সূচক আগেই নিম্নমুখী ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর সেই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে বলে বিভিন্ন জনমত জরিপের বরাত দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া মার্কিন নাগরিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন। যুদ্ধ শুরুর পর প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের অনুমোদন হার ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে এবং অননুমোদনের হার ৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে বলেও সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এসব পরিসংখ্যান নির্দিষ্ট কোন জরিপের ভিত্তিতে তৈরি, তা যাচাই না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।

আরব মিত্রদের আস্থায় ফাটল

যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রভাবগুলোর একটি হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থার পরিবর্তন।

সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে এসেছে। কাতারকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া, কাতার-কুয়েত-বাহরাইনকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেজর নন-ন্যাটো মিত্র’ হিসেবে স্বীকৃতি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি—এসব ব্যবস্থার পরও সাম্প্রতিক সংঘাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকির বাইরে থাকতে পারেনি।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু রাষ্ট্র এখন ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ঝুঁকি নতুন করে হিসাব করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রকে তারা যদি আগের তুলনায় কম নির্ভরযোগ্য বা বেশি অনিশ্চিত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে বিকল্প নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের প্রবণতা বাড়তে পারে।

‘পোস্ট-আমেরিকান’ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রযাত্রা?

এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি পোস্ট-আমেরিকান আঞ্চলিক কাঠামোর দিকে ধীর পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এর অন্যতম উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত চুক্তি। ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই সমঝোতায় তিন দেশ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছে। চুক্তির অন্যতম তাৎপর্য হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সম্মিলিতভাবে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার নীতি।

তিন দেশের প্রত্যেকটির নিজস্ব শক্তি ও দুর্বলতা রয়েছে।

সৌদি আরবের বড় শক্তি তার আর্থিক সক্ষমতা। তবে হুথি হামলা, সামুদ্রিক অবরোধের ঝুঁকি এবং ইরানের হামলার অভিজ্ঞতা দেশটির নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক সক্ষমতা ও বড় সামরিক অবকাঠামো। অন্যদিকে অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ দেশটির বড় চ্যালেঞ্জ।

তুরস্ক এ জোটে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে আসছে। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

তবে তুরস্কের নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ উত্তেজনা এবং ন্যাটোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে—এ নিয়ে আঙ্কারার হিসাবও বদলাতে পারে।

চুক্তিটি কি ইরানবিরোধী?

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই সমঝোতাকে সরাসরি ইরানবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে পশ্চিম এশিয়ার নতুন শক্তি-সমীকরণ যে এই চুক্তির প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করেছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।

যুদ্ধের পর ইরান আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে—এমন বিশ্লেষণও রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন কাঠামো নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানও বদলাচ্ছে

যুদ্ধের অভিঘাত পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপরও। আবুধাবি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বিশেষ করে মোহাম্মদ বিন জায়েদ আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু নতুন পরিস্থিতিতে সেই প্রভাব আগের মতো কার্যকর থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক কাঠামোয় সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইরানের মতো শক্তিগুলোর সক্রিয়তা বাড়লে আবুধাবির ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে কমে যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী চীন?

ইরান যুদ্ধের আরেকটি বড় ভূরাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে চীনের নাম উঠে আসছে।

ওয়াশিংটন যখন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যয়ের চাপে পড়ছে এবং মিত্রদের সঙ্গে মতপার্থক্যে জড়াচ্ছে, তখন বেইজিং তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে।

চীনের কৌশলগত হিসাব হলো—যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন ও বৈদেশিক সংঘাতে ব্যস্ত থাকবে, তত বেশি সুযোগ পাবে বেইজিং। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাকে চীন তার দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে।

জ্বালানি বাজারেও চীনের প্রভাব

চীনের প্রভাব শুধু কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় বেইজিংয়ের সহযোগিতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

সংকটের সময়ে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে চীন যদি এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার কৌশলগত প্রভাব বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির বাজারেও চীন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি উৎপাদনে চীনের বড় বাজার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যুদ্ধের ফলে তেলনির্ভর অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হলে বিকল্প জ্বালানি প্রযুক্তির বাজারে চীনের অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে।

ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মিত্রের সঙ্গে ওয়াশিংটনের মতপার্থক্যও সামনে এসেছে।

যুদ্ধের বৈধতা, সামরিক পদক্ষেপের ধরন এবং সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে মিত্রদের মধ্যে মতবিরোধ যত বাড়বে, ততই পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

এই বিভাজনকে চীন কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে চাইবে—এমন সম্ভাবনাও বিশ্লেষকদের আলোচনায় রয়েছে।

একটি যুদ্ধ, বহু পরিবর্তনের সূচনা

ইরান যুদ্ধের প্রকৃত দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে এরই মধ্যে কয়েকটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে—মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে এবং চীন সেই পরিবর্তনের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে।

অর্থাৎ, ওয়াশিংটন হয়তো ইরানকে লক্ষ্য করে একটি সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে চেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর ঢেউ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির প্রতিযোগিতা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

একটি সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—যুদ্ধের ফল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হয় না; তার প্রকৃত প্রভাব বোঝা যায় যুদ্ধের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মানচিত্রে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন