শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

২২ লাখের গাজায় ৭২ হাজারের বেশি প্রাণহানি, যুদ্ধের ক্ষত আরও গভীর

মাত্র প্রায় ২২ লাখ মানুষের ভূখণ্ড গাজা। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ, বাস্তুচ্যুতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপর্যয়ের মধ্যে সেখানে প্রাণহানির সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংস্থাগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৭ জুন পর্যন্ত গাজায় ৭৩ হাজার ১৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৬৫ জন। জাতিসংঘ অবশ্য স্পষ্ট করে বলেছে, এসব সংখ্যা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত; সব তথ্য স্বাধীনভাবে জাতিসংঘের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। 

এই প্রাণহানির ব্যাপ্তি বোঝাতে গাজার যুদ্ধপূর্ব জনসংখ্যার দিকে তাকালেই চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। যুদ্ধ শুরুর আগে উপত্যকাটিতে প্রায় ২২ লাখ মানুষ বসবাস করতেন। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের সাম্প্রতিক নথিতে গাজার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২১ লাখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

শুধু ৭২ হাজারের হিসাবেই শেষ নয়

গাজার মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সাম্প্রতিক স্বাধীন গবেষণাগুলোও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। The Lancet Global Health-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় প্রায় ৭৫ হাজার ২০০টি সহিংস মৃত্যু হয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। গবেষকদের হিসাব ওই সময়ের গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। 

গবেষণাটিতে প্রায় ২ হাজার পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যেখানে ৯ হাজার ৭২৯ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে হাসপাতাল, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান ও মৃত্যুর নিবন্ধনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরকারি তালিকায় প্রকৃত প্রাণহানি সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মরদেহ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের কারণে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। 

নিহতদের বড় অংশ নারী, শিশু ও প্রবীণ

গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—নিহতদের একটি বড় অংশ ছিল বেসামরিক মানুষ। গবেষণায় দেখা যায়, নারী, শিশু ও প্রবীণরা মিলিয়ে সহিংসতায় নিহতদের প্রায় ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ। 

জাতিসংঘের ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিলের গাজা পরিস্থিতি প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শনাক্ত ৭১ হাজার ৪৪৪ নিহতের মধ্যে ২১ হাজার ২৮৩ শিশু, ১০ হাজার ৯৮৩ নারী, ৫ হাজার ১০০ প্রবীণ এবং ৩৪ হাজার ৭৮ জন পুরুষের তথ্য দেওয়া হয়েছে। 

অর্থাৎ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ জনগণকেই—শিশু, নারী, বয়স্ক এবং পরিবারগুলোকে।

ধ্বংসস্তূপের নিচে কতজন—নির্দিষ্ট হিসাব নেই

গাজায় বিপুলসংখ্যক ভবন ও অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় অনেক নিহতের মরদেহ এখনো শনাক্ত বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গবেষকদের মতে, হাসপাতাল ও নাগরিক নিবন্ধনব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ কারণে সরকারি হিসাবে প্রকাশিত মৃত্যুর সংখ্যা এবং প্রকৃত প্রাণহানির মধ্যে পার্থক্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। Lancet Global Health-এর গবেষণায় শুধু সরাসরি সহিংসতার বাইরে যুদ্ধের কারণে বাড়তি মৃত্যুর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গবেষণায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার ৩০০টি অতিরিক্ত অ-সহিংস মৃত্যুর হিসাবও অনুমান করা হয়। 

যুদ্ধের ক্ষতি শুধু মৃত্যুর সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়

গাজায় যুদ্ধের প্রভাব শুধু নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই। স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আবাসন, পানি, খাদ্য, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্যানিটেশন—প্রায় প্রতিটি মৌলিক অবকাঠামোই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২০২৬ সালের জুনে জাতিসংঘের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে গাজায় ১ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি আহতের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ অব্যাহত রয়েছে। 

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, গাজার ক্যানসার রোগীদের মৃত্যুহার যুদ্ধের আগের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে বলে স্থানীয় চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। গাজার একমাত্র বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতাল ধ্বংস হওয়া এবং চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় প্রায় ১৭ হাজার রোগী স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি প্রাণহানি

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় সহিংসতার ঘটনা অব্যাহত থাকার খবর এসেছে। রয়টার্সের ২০২৬ সালের ১৮ জুনের প্রতিবেদনে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়, যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। 

ফলে যুদ্ধবিরতি সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি—এমন উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।

৭২ হাজারের সংখ্যা কেন গুরুত্বপূর্ণ

৭২ হাজার বা ৭৩ হাজার—শুধু একটি সংখ্যা নয়। গাজার যুদ্ধের ব্যাপ্তি বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সূচক। যুদ্ধপূর্ব প্রায় ২২ লাখ মানুষের একটি ছোট ভূখণ্ডে এত বিপুল প্রাণহানি জনসংখ্যাগত ও সামাজিকভাবে গভীর প্রভাব ফেলছে।

জাতিসংঘের তথ্যে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে গাজার জনসংখ্যা প্রায় ২১ লাখ দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় পুরো ভূখণ্ডজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রা ও অবকাঠামোর ওপর যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। 

প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মৃত্যুর হিসাব নিয়ে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক স্বাধীন গবেষণাগুলো সরকারি তালিকাকে সম্পূর্ণ বাতিল না করে বরং সম্ভাব্য ন্যূনতম হিসাব বা ‘floor’ হিসেবে দেখিয়েছে। গবেষকদের মতে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধন করা অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় সরকারি হিসাব প্রকৃত প্রাণহানির চেয়ে কম হতে পারে। 

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ৬৩-এ পৌঁছানোর কথা জানানো হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে স্বাধীন গবেষণায় এর আগের সময়পর্বেই ৭৫ হাজারের বেশি সহিংস মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। 

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পুনর্গঠন ও মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা

গাজায় যুদ্ধের তীব্রতা কমলেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শুধু যুদ্ধ বন্ধ করাই সংকটের সমাধান নয়। নিহতদের মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্তকরণ, আহতদের চিকিৎসা, ধ্বংস হওয়া হাসপাতাল পুনর্গঠন, বাস্তুচ্যুত মানুষের আবাসন, বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সরবরাহ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন—সবকিছুই দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দাবি করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার বর্তমান মানবিক সংকটের পূর্ণ চিত্র পেতে শুধু সরকারি মৃত্যুর সংখ্যা নয়, নিখোঁজ ব্যক্তি, ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মরদেহ, চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু এবং যুদ্ধ-পরবর্তী অতিরিক্ত মৃত্যুহার—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

২২ লাখের একটি ভূখণ্ডে ৭২ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু তাই কেবল একটি যুদ্ধের পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি। আর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সরকারি হিসাবে দৃশ্যমান সংখ্যাটিও হয়তো গাজার প্রকৃত মানবিক ক্ষতির পুরো চিত্র তুলে ধরছে না। 


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন