শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

দেশের জ্বালানি সংকট কাঠামোগত, ২০৩১ সালের মধ্যে গ্যাস মজুত শেষ হওয়ার শঙ্কা

দেশে গ্যাসের সংকট এখন আর কেবল সাময়িক সমস্যা নয়; এটি ক্রমেই কাঠামোগত জ্বালানি সংকটে রূপ নিচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ার বিপরীতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সংস্থাটি বলছে, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এলএনজি আমদানির ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবেলা: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথরেখা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব সুপারিশ তুলে ধরে সিপিডি।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফকরুদ্দিন আল কবির। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। আলোচনায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ২৯ শতাংশ এলএনজি থেকে

সিপিডির উপস্থাপিত গবেষণা প্রবন্ধে বাংলাদেশের গ্যাস খাতের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের ২৮ দশমিক ৮২ শতাংশ এসেছে আমদানি করা এলএনজি থেকে।

অর্থাৎ দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শিল্প, বিদ্যুৎ, সার উৎপাদন ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা অব্যাহত থাকায় ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম, ডলার বিনিময় হার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছে সিপিডি।

দৈনিক ঘাটতি ১২০০-১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে বলে আলোচনা সভায় জানানো হয়।

এই ঘাটতি কেবল উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে তৈরি হয়নি। গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ধীরগতি, উৎপাদন ও সরবরাহ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আমদানি করা এলএনজির ওপর বাড়তে থাকা নির্ভরতা—সব মিলিয়ে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।

সিপিডির মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে একই সঙ্গে সরবরাহ বাড়ানো এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

২০৩১ সালে গ্যাস মজুত শেষ হওয়ার শঙ্কা

গবেষণা প্রবন্ধে ভবিষ্যৎ গ্যাস সরবরাহ নিয়ে সতর্ক করে বলা হয়, বর্তমান হারে গ্যাস ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত প্রায় শেষ হয়ে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতি এড়াতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মতে, শুধু আমদানি করা এলএনজির মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নাও হতে পারে। বরং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির আধিপত্য

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাও এখনো ব্যাপকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বলে জানিয়েছে সিপিডি।

সংস্থাটির উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৮৪ শতাংশের বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবিদ্যুতের অবদান এখনো সীমিত।

সিপিডি বলছে, এই নির্ভরতা কমাতে হলে সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল ও কার্যকর নীতিগত কাঠামো প্রয়োজন।

তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে চার সুপারিশ

জ্বালানি সংকট সামাল দিতে সিপিডি স্বল্পমেয়াদে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

এলএনজি সংগ্রহ ব্যবস্থার উন্নয়ন: আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার ঝুঁকি কমাতে এলএনজি সংগ্রহ ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় দক্ষতা বাড়াতে হবে।

জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা: জ্বালানি সম্পদের অপচয় কমাতে মূল্য নির্ধারণের কার্যকর পদ্ধতি চালু এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা: জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর যাতে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।

বেসরকারি বিনিয়োগ নীতির পুনর্মূল্যায়ন: জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালা পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।

মধ্যমেয়াদে টার্মিনাল ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের এলএনজি টার্মিনাল ও সংরক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছে সিপিডি।

একই সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গ্যাস উৎপাদন ও আমদানির পর তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাইপলাইন ও বিতরণ অবকাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি।

জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের তাগিদ

সিপিডির মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণে সময়সীমাভিত্তিক নীতি গ্রহণ করতে হবে।

এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস, এলএনজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যান্য সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের জন্য শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নয়, বরং বিনিয়োগ, গ্রিড সংযোগ, মূল্য নির্ধারণ এবং নীতিগত সহায়তার একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত জ্বালানি মজুত

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ বিঘ্ন বা ভূরাজনৈতিক সংকটের মতো পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ যাতে বড় ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে, সে জন্য কৌশলগত মজুত গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া জ্বালানি খাতের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় জরুরি কর্মসূচি

দেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে জাতীয় জরুরি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি।

সংস্থাটির মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। ফলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদনে আনার ক্ষেত্রে যে সময় প্রয়োজন, সেটিও সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাই স্থলভাগের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় সমুদ্রাঞ্চলেও অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুততর করার প্রয়োজন রয়েছে।

শিল্প উৎপাদনে পড়ছে গ্যাস সংকটের প্রভাব

গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের শিল্প খাতে পড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে সিপিডি।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক, সার কারখানা এবং গ্যাসনির্ভর অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় উৎপাদন কমাতে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।

গ্যাস সরবরাহে চাপ কমে গেলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাড়ে উৎপাদন ব্যয় এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতাও কমে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে।

গ্যাস সংকট শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়

সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়, গ্যাসের ঘাটতিকে শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে দেশের শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, কৃষি, সার উৎপাদন, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

গ্যাসের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ বাড়বে, অন্যদিকে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়ে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

টেকসই সমাধানে সমন্বিত পথরেখার প্রয়োজন

সিপিডির মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের কোনো একক সমাধান নেই। এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সাময়িক ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিকল্প নয়।

অন্যদিকে শুধু দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর নির্ভর করাও যথেষ্ট হবে না। এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, জ্বালানি সাশ্রয়, অবকাঠামো উন্নয়ন, কার্যকর মূল্য নির্ধারণ এবং আমদানির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির সুপারিশ অনুযায়ী, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা, মধ্যমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রূপান্তর—এই তিন স্তরের পরিকল্পনা একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।

আলোচনা সভায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি, গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি, এলএনজি আমদানি, দেশীয় অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা নিয়ে মতামত দেন।

সিপিডির বক্তব্যে মূল বার্তাটি স্পষ্ট—আমদানি করা এলএনজি দিয়ে বর্তমান ঘাটতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি এখনই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তা না হলে ক্রমবর্ধমান চাহিদা, কমতে থাকা দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানিনির্ভরতার সমন্বিত চাপ আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন