বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

ভারতে নতুন ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল গড়ল অ্যাক্সেল, নজরে এআই ও গভীর প্রযুক্তি

ভারতে স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগের জন্য নতুন করে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠন করেছে মার্কিন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সেল। আগের ভারত-কেন্দ্রিক ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে নতুন এই তহবিল সংগ্রহ করল প্রতিষ্ঠানটি।

একই সময়ে অ্যাক্সেল বিশ্বব্যাপী মোট ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহের অংশ হিসেবে নতুন ভারতীয় তহবিলটি গঠন করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ জানিয়েছে, নতুন তহবিলটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্থ পেয়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বন্ধ করা হয়।

তবে অ্যাক্সেলের আগের ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের ভারতীয় তহবিলের এখনও ৫৫ শতাংশের বেশি অর্থ বিনিয়োগের জন্য অব্যবহৃত রয়েছে। অর্থাৎ আগের তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূলধন থাকা সত্ত্বেও নতুন তহবিল সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

অ্যাক্সেলের অংশীদার শেখর কিরানি জানিয়েছেন, নতুন তহবিল থেকে বিনিয়োগ শুরু হতে পারে ২০২৭ সালে। তার আগে প্রতিষ্ঠানটি আগের ভারতীয় তহবিল থেকেই নতুন বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবে।

এআইয়ের পাশাপাশি ভোক্তা ও ফিনটেক খাতেও নজর

ভারতের পরবর্তী স্টার্টআপ প্রবাহ শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছে অ্যাক্সেল। প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে থাকছে এআই, কনজ্যুমার ইন্টারনেট, ফিনটেক, অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং এবং ডিপ টেক

অ্যাক্সেলের অংশীদার শেখর কিরানির ভাষ্য, এসব খাতে প্রাথমিক পর্যায়ের বিনিয়োগের জন্য বাজারে পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে। স্থানীয় বাজারে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা ও কোম্পানি খুঁজে তাদের বৈশ্বিক পর্যায়ে সফল করে তোলাই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য।

অ্যাক্সেলের দৃষ্টিতে এআই এখন আর আলাদা কোনো প্রযুক্তি খাত নয়; বরং এটি বিভিন্ন শিল্পের জন্য একটি হরাইজন্টাল প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করছে। ফলে এআইয়ের সঙ্গে ভোক্তা প্রযুক্তি, ফিনটেক, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সফটওয়্যার ব্যবসার সমন্বয় আগামী দিনে বড় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ফাউন্ডেশন মডেলের বদলে অ্যাপ্লিকেশন স্তরে সুযোগ দেখছে অ্যাক্সেল

বিশ্বব্যাপী এআই বিপ্লবের প্রথম পর্যায়ে ভারত বড় ভাষা মডেল বা ফাউন্ডেশন মডেল তৈরির প্রতিযোগিতায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল। তবে অ্যাক্সেলের মতে, ভারতের জন্য বড় সুযোগ রয়েছে এআই অ্যাপ্লিকেশন, অবকাঠামো এবং এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার তৈরিতে।

অ্যাক্সেলের অংশীদার প্রয়াঙ্ক স্বরূপ বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের কোম্পানিগুলোর বড় অংশ বড় ভাষা মডেল তৈরির দিকে এগিয়েছে। কিন্তু এখন এআইয়ের অ্যাপ্লিকেশন স্তরে উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তার মতে, ভারতীয় স্টার্টআপগুলো বিদ্যমান বড় ভাষা মডেলের ওপর ভিত্তি করে এআই-চালিত অ্যাপ্লিকেশন ও এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাদের শক্তি হবে ভারতের প্রকৌশল দক্ষতা এবং বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিনের প্রযুক্তি ও সেবা-ভিত্তিক অভিজ্ঞতা।

বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে মানুষের তদারকি এখনও গুরুত্বপূর্ণ, সেসব খাতে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন ব্যবসা তৈরির সুযোগ দেখছে অ্যাক্সেল।

স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের উদাহরণ RapidClaims

ভারতের এআইভিত্তিক স্টার্টআপগুলোর সম্ভাবনা বোঝাতে অ্যাক্সেল তাদের বিনিয়োগ করা RapidClaims-এর উদাহরণ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য মেডিকেল কোডিং স্বয়ংক্রিয় করতে এআই ব্যবহার করছে।

অ্যাক্সেলের তথ্য অনুযায়ী, RapidClaims এআই প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান যুক্ত করে প্রায় ৯৫ শতাংশ নির্ভুলতায় মেডিকেল কোডিংয়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এই খাতটি ঐতিহ্যগতভাবে ভারত ও ফিলিপাইনের মানবসম্পদনির্ভর আউটসোর্সিংয়ের ওপর নির্ভরশীল।

অ্যাক্সেলের মতে, এ ধরনের মডেল দেখায় কীভাবে ভারতীয় স্টার্টআপগুলো এআইয়ের সঙ্গে বিদ্যমান দক্ষতা ও শিল্প-জ্ঞান যুক্ত করে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পণ্য তৈরি করতে পারে।

দেশে এআই ব্যবহারের বিস্তারেও আশাবাদ

অ্যাক্সেলের অংশীদার ভারত শঙ্কর সুব্রামানিয়ানের মতে, ভারতের ভোক্তা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এআই গ্রহণের গতি দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য সফটওয়্যার তৈরি নয়, দেশের অভ্যন্তরেও এআইনির্ভর পণ্যের জন্য বড় বাজার তৈরি হচ্ছে।

বিশ্বের শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোর সাম্প্রতিক প্রবণতাতেও ভারতের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক—দুটি প্রতিষ্ঠানই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নিজেদের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে ভারতকে চিহ্নিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এআই কোডিং প্ল্যাটফর্ম কার্সরও জানিয়েছে, তাদের দ্রুততম বর্ধনশীল ডেভেলপার বাজারগুলোর একটি ভারত এবং পাওয়ার ইউজারের সংখ্যার দিক থেকেও দেশটি তাদের সবচেয়ে বড় বাজার।

ভারতমুখী বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল

বিশ্বজুড়ে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগে কিছুটা মন্থরতা থাকলেও ভারতকে ঘিরে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নতুন করে বাড়ছে।

সিকোয়া ক্যাপিটালের সাবেক ভারতীয় ব্যবসা Peak XV Partners সম্প্রতি ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেন্দ্রিক নতুন তহবিলের মাধ্যমে মোট ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। অন্যদিকে General Catalyst আগামী পাঁচ বছরে ভারতে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া Lightspeed Venture Partners ভারতকেন্দ্রিক ৩০০ থেকে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের নতুন তহবিল গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

অ্যাক্সেলের শেখর কিরানির মতে, ভারতীয় উদ্যোক্তাদের ধারণা, সক্ষমতা ও বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার মান গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। এ কারণেই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারত এখন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

একসঙ্গে চার তহবিল

নতুন ভারতীয় তহবিলটি অ্যাক্সেলের বৃহত্তর ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমন্বিত তহবিল সংগ্রহ কর্মসূচির অংশ। প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটি একই সময়ে চারটি তহবিল সংগ্রহ করেছে।

ভারতীয় তহবিলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জন্য পৃথক তহবিল এবং ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের একটি গ্রোথ ফান্ড গঠন করেছে অ্যাক্সেল।

এই গ্রোথ ফান্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন আঞ্চলিক তহবিল থেকে উঠে আসা দ্রুত বর্ধনশীল কোম্পানিতে পরবর্তী ধাপের বিনিয়োগ করতে পারবে। ফলে কোনো কোম্পানির প্রাথমিক পর্যায়ের বিনিয়োগ থেকে শুরু করে আইপিও এবং তার পরবর্তী সময় পর্যন্ত বিনিয়োগ ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

কিরানির ভাষ্য, আলাদা আলাদা আঞ্চলিক তহবিল সংগ্রহের পরিবর্তে অ্যাক্সেলের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মকে একসঙ্গে মূল্যায়ন করতে চেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এ কারণেই সমন্বিতভাবে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শুরুতেই বিনিয়োগ অ্যাক্সেলের মূল কৌশল

নতুন তহবিল গঠনের পরও অ্যাক্সেল তার পুরোনো বিনিয়োগ কৌশল থেকে সরে আসছে না। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী পর্যায়ের জনপ্রিয় প্রবণতার পেছনে ছোটা নয়, বরং স্টার্টআপের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানোর কৌশলেই জোর দিচ্ছে।

অ্যাক্সেলের দাবি, তারা যেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে তার প্রায় ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রেই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে অর্থ দেয়।

এই কৌশলের আওতায় প্রতিষ্ঠানটি ভারতের Flipkart, Swiggy, Freshworks ও Zetwerk-এর মতো কোম্পানির প্রাথমিক পর্যায়ে বিনিয়োগ করেছে। অ্যাক্সেলের নতুন ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের ভারতীয় তহবিলও মূলত দেশটির পরবর্তী প্রজন্মের এমন স্টার্টআপ খুঁজে বের করা এবং তাদের বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলার লক্ষ্যেই ব্যবহৃত হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন