মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: যে যুদ্ধ বদলে দিয়েছিল পৃথিবীর মানচিত্র

চার বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, কোটি মানুষের মৃত্যু এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল এমন এক সংঘাত, যা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বদলে দিয়েছিল বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র, অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামো। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধকে সে সময় ‘দ্য গ্রেট ওয়ার’ বা ‘মহাযুদ্ধ’ বলা হতো। ইউরোপকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

চার বছরের এই যুদ্ধে ৯০ লাখের বেশি সামরিক সদস্য নিহত হন এবং যুদ্ধ ও এর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবে প্রায় ৭০ লাখ বেসামরিক মানুষও প্রাণ হারান বলে Library of Congress-এর ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

এই যুদ্ধের পর ইউরোপের চারটি বৃহৎ সাম্রাজ্য—জার্মান, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়, অটোমান ও রুশ সাম্রাজ্য—ভেঙে পড়ে। জন্ম নেয় নতুন রাষ্ট্র, নতুন রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যুদ্ধের পর আরোপিত কঠোর শান্তিচুক্তি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথও প্রশস্ত করে।

যুদ্ধের পেছনে কী ছিল?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য একটি মাত্র ঘটনাকে দায়ী করা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে জমে থাকা রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করেছিল।

এর পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ছিল—

১. সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা:
ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলো এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের উপনিবেশ ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল।

২. জাতীয়তাবাদ:
বিশেষ করে বলকান অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

৩. সামরিক জোট:
ইউরোপের বড় শক্তিগুলো পরস্পরের সঙ্গে বিভিন্ন সামরিক জোট গড়ে তুলেছিল। ফলে একটি দেশের সঙ্গে সংঘাত দ্রুত একাধিক দেশের যুদ্ধে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

৪. অস্ত্র প্রতিযোগিতা:
যুদ্ধের আগে ইউরোপের বড় শক্তিগুলো সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী সম্প্রসারণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছিল।

৫. বলকান সংকট:
অটোমান সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে বলকান অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার নিয়ে রাশিয়া, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও অন্যান্য শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছিল।

এই সব উত্তেজনার মধ্যে ১৯১৪ সালের একটি হত্যাকাণ্ড পুরো ইউরোপকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।

যে হত্যাকাণ্ডে শুরু হলো মহাযুদ্ধ

১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার সারায়েভোতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রানৎস ফার্ডিনান্ড এবং তাঁর স্ত্রী সোফি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সার্বীয় জাতীয়তাবাদী চক্রের যোগসূত্রের অভিযোগ ওঠে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়।

এর এক মাস পর, ২৮ জুলাই ১৯১৪, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর মিত্রতা ও পাল্টা মিত্রতার কারণে সংঘাত দ্রুত ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

জার্মানি অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির পাশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে সার্বিয়ার প্রতি রাশিয়ার সমর্থন, রাশিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের জোট এবং ব্রিটেনের যুদ্ধে প্রবেশ পরিস্থিতিকে পূর্ণাঙ্গ ইউরোপীয় যুদ্ধে পরিণত করে।

দুই শিবিরে বিভক্ত ইউরোপ

যুদ্ধের প্রধান পক্ষগুলো মোটামুটি দুটি বৃহৎ জোটে বিভক্ত ছিল।

মিত্রশক্তি

প্রধান দেশগুলোর মধ্যে ছিল—

  • ব্রিটেন
  • ফ্রান্স
  • রাশিয়া
  • পরে ইতালি
  • পরে যুক্তরাষ্ট্র
  • সার্বিয়া
  • বেলজিয়াম
  • জাপানসহ আরও কয়েকটি দেশ

কেন্দ্রীয় শক্তি

প্রধান দেশগুলোর মধ্যে ছিল—

  • জার্মানি
  • অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি
  • অটোমান সাম্রাজ্য
  • বুলগেরিয়া

যুদ্ধ যত এগিয়েছে, উভয় পক্ষের সঙ্গে আরও বহু দেশ যুক্ত হয়েছে। ফলে ইউরোপের সংঘাত ক্রমেই বৈশ্বিক যুদ্ধে পরিণত হয়।

বেলজিয়াম আক্রমণ ও পশ্চিম ফ্রন্ট

জার্মানির যুদ্ধ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দ্রুত ফ্রান্সকে পরাজিত করা। এজন্য জার্মান বাহিনী নিরপেক্ষ বেলজিয়ামের ভূখণ্ড দিয়ে ফ্রান্সে প্রবেশ করে।

বেলজিয়ামে জার্মান আক্রমণের পর ব্রিটেন যুদ্ধে প্রবেশ করে। ১৯১৪ সালের আগস্টে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যায়।

কিন্তু জার্মানির দ্রুত বিজয়ের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। সেপ্টেম্বর ১৯১৪-এর প্রথম মার্নের যুদ্ধে মিত্রবাহিনী জার্মান অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়।

এরপর পশ্চিম ফ্রন্টে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী ট্রেঞ্চ যুদ্ধ। দুই পক্ষ মাটির নিচে ও মাটির ওপর দীর্ঘ প্রতিরক্ষা অবস্থান তৈরি করে বছরের পর বছর যুদ্ধ চালিয়ে যায়।

ট্রেঞ্চে আটকে থাকা সৈন্যদের যুদ্ধ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি ছিল ট্রেঞ্চ বা পরিখা যুদ্ধ।

সৈন্যরা দীর্ঘ সময় ধরে পরিখায় অবস্থান করতেন। বৃষ্টি, কাদা, ঠান্ডা, রোগ, খাদ্যসংকট এবং অবিরাম গোলাবর্ষণ তাদের জীবনকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছিল।

Library of Congress-এর Veterans History Project-এ সংরক্ষিত যুদ্ধস্মৃতিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ট্রেঞ্চগুলোকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সৈন্যদের আবাসস্থল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হয়।

১৯১৫: যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে আরও বিস্তৃত অঞ্চলে

১৯১৫ সালে যুদ্ধের পরিধি আরও বাড়ে। সমুদ্রযুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য, বলকান ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলও সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

এই সময় জার্মান সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

৭ মে ১৯১৫, ব্রিটিশ যাত্রীবাহী জাহাজ লুসিটানিয়া জার্মান সাবমেরিনের আক্রমণে ডুবে যায়। প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে ১২৮ জন ছিলেন মার্কিন নাগরিক। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের জনমতকে জার্মানির বিরুদ্ধে আরও কঠোর করে তোলে।

১৯১৬: ভার্দুন ও সোম—রক্তক্ষয়ের বছর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ভার্দুনের যুদ্ধ

১৯১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ প্রায় নয় মাস স্থায়ী হয়। একই বছরে শুরু হয় সোমের যুদ্ধ

সোমের যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক সৈন্য হতাহত হয়। Library of Congress-এর ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানে ব্রিটিশ, ফরাসি ও জার্মান বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির উল্লেখ রয়েছে।

১৯১৬ সালের যুদ্ধগুলো স্পষ্ট করে দেয়—আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তির যুগে যুদ্ধ কতটা ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

যুদ্ধে যুক্ত হয় ভারতীয় উপমহাদেশ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।

১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভারত থেকে প্রায় ২৪ হাজার সৈন্য ফ্রান্সে পৌঁছে মিত্রবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেন বলে Library of Congress-এর নথিতে উল্লেখ আছে।

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৈন্য সংগ্রহ করা হয়। ইউরোপের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রেও ভারতীয় সৈন্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

আজকের বাংলাদেশের ভূখণ্ডও তখন ব্রিটিশ ভারতের অংশ ছিল। ফলে বৃহত্তর বাংলার মানুষও সেই সাম্রাজ্যিক যুদ্ধ প্রচেষ্টার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

১৯১৭: যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র

১৯১৭ সাল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।

জার্মানি ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সীমাহীন সাবমেরিন যুদ্ধ পুনরায় শুরু করে। এর ফলে নিরপেক্ষ দেশগুলোর জাহাজও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

এর পাশাপাশি প্রকাশ্যে আসে জিমারম্যান টেলিগ্রাম, যেখানে জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে মেক্সিকোকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছিল।

৬ এপ্রিল ১৯১৭, যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা মিত্রশক্তির অবস্থানকে শক্তিশালী করে।

একই বছরে রাশিয়ার বিপ্লব

১৯১৭ সালে আরেকটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে রাশিয়ায়।

রুশ সাম্রাজ্যে বিপ্লবের ফলে জার দ্বিতীয় নিকোলাস ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। পরে বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করে।

শেষ পর্যন্ত রাশিয়া যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে এগোয় এবং ১৯১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।

১৯১৮ সালের ৩ মার্চ রাশিয়া জার্মানির সঙ্গে ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যায়।

১৯১৮: শেষ লড়াই

১৯১৮ সালের শুরুতে জার্মানি পশ্চিম ফ্রন্টে বড় আকারের আক্রমণ চালায়। উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সামরিক শক্তি ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই মিত্রবাহিনীকে পরাজিত করা।

কিন্তু জার্মানির আক্রমণ শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেনি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য ও সম্পদ ক্রমে মিত্রশক্তিকে শক্তিশালী করে।

১৯১৮ সালের দ্বিতীয়ার্ধে মিত্রবাহিনী ধারাবাহিকভাবে জার্মান বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় শক্তির অন্য দেশগুলোও যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করে।

১১ নভেম্বর ১৯১৮: যুদ্ধ থামল

শেষ পর্যন্ত জার্মানির সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে।

১১ নভেম্বর ১৯১৮ জার্মানি মিত্রশক্তির সঙ্গে অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয়।

এর মধ্য দিয়ে চার বছরের মহাযুদ্ধের সামরিক পর্বের অবসান ঘটে। Library of Congress-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত চলা এই সংঘাতে আট মিলিয়নেরও বেশি সৈন্য প্রাণ হারান—যদিও বিভিন্ন ঐতিহাসিক উৎসে সামরিক ও বেসামরিক মৃত্যুর হিসাবের পদ্ধতি ভিন্ন।

যুদ্ধের পর পৃথিবীর মানচিত্র বদলে গেল

যুদ্ধ শেষ হলেও তার অভিঘাত শেষ হয়নি।

অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য ভেঙে যায়। অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। রুশ সাম্রাজ্যের জায়গায় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। জার্মান সাম্রাজ্যেরও অবসান ঘটে।

ইউরোপে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং বহু সীমান্ত নতুন করে নির্ধারণ করা হয়।

একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইউরোপের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন এবং বহু দেশের জাতীয় ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

ভার্সাই চুক্তি: শান্তি, নাকি ভবিষ্যৎ সংঘাতের বীজ?

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯১৯ সালে প্যারিস শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

২৮ জুন ১৯১৯ জার্মানি ও মিত্রশক্তির প্রতিনিধিরা ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তিটি ১৯২০ সালের ১০ জানুয়ারি কার্যকর হয়।

চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির ওপর কঠোর রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক শর্ত আরোপ করা হয়।

জার্মানির ওপর যুদ্ধের দায় আরোপ, ভূখণ্ড হারানো এবং ক্ষতিপূরণের বোঝা দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।

পরবর্তী সময়ে জার্মানিতে চরম জাতীয়তাবাদ ও নাৎসিবাদের উত্থানের পেছনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর এরই ধারাবাহিকতায় মাত্র দুই দশকের মধ্যে বিশ্ব আবারও আরও ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

লীগ অব নেশনসের জন্ম

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ভবিষ্যতে এমন সংঘাত প্রতিরোধের জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে।

১৯১৯ সালের শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধ প্রতিরোধে যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

তবে প্রতিষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে পারেনি। পরে ১৯৪৬ সালে লীগ অব নেশনস বিলুপ্ত হয় এবং এর উত্তরসূরি হিসেবে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রযুক্তির যুদ্ধও ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের বড় উদাহরণ।

এই যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়—

  • ভারী কামান
  • মেশিনগান
  • সামরিক বিমান
  • ট্যাংক
  • সাবমেরিন
  • রেলপথভিত্তিক দ্রুত সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহন
  • আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা

১৯১৬ সালের সোমের যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী প্রথমবারের মতো ট্যাংক ব্যবহার করে।

অর্থাৎ যুদ্ধের ধরনও বদলে যাচ্ছিল। সৈন্যদের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, রেলপথ, বন্দর, খাদ্য সরবরাহ এবং অর্থনীতি—সবকিছুই যুদ্ধের অংশ হয়ে উঠেছিল।

যুদ্ধের সামাজিক অভিঘাত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব শুধু সৈন্যদের ওপর পড়েনি। ঘরের ভেতরেও এর গভীর প্রভাব তৈরি হয়।

পুরুষেরা বিপুলসংখ্যায় যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নারীরা কারখানা, হাসপাতাল, পরিবহন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা নিতে শুরু করেন।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়।

একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে লাখ লাখ পরিবার স্বজন হারায়। বহু সৈন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশে ফেরেন।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল বিপুল ব্যয়ের যুদ্ধ।

যুদ্ধ পরিচালনায় বিভিন্ন দেশকে বিপুল ঋণ নিতে হয়। কর বৃদ্ধি ও সরকারি ঋণ ব্যাপকভাবে বাড়ে। Library of Congress-এর সংরক্ষিত ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানে যুদ্ধের মোট ব্যয় ও বিভিন্ন দেশের জাতীয় ঋণের ব্যাপক বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া যায়।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও অর্থনৈতিক সংকট থেকে যায়। ইউরোপের শিল্প ও কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—একটি আঞ্চলিক সংকট কীভাবে জোট, সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ ও সামরিক প্রতিযোগিতার কারণে বৈশ্বিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।

১৯১৪ সালের সারায়েভোর হত্যাকাণ্ড একা কোনো বিশ্বযুদ্ধ সৃষ্টি করেনি। এর পেছনে ছিল বহু বছরের রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামরিক জোট, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ও জাতীয়তাবাদ।

আর ১৯১৮ সালের যুদ্ধবিরতি সমস্যার সব সমাধান করতে পারেনি। বরং যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা নতুন সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।

চার বছরের যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর। কিন্তু এর প্রভাব শেষ হয়নি সেদিন।

এর ফলেই ভেঙে যায় পুরোনো সাম্রাজ্যগুলো, নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, রাশিয়ায় বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্থান ঘটে, ইউরোপের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন শক্তির আবির্ভাব ঘটে।

সবচেয়ে বড় কথা, ‘যুদ্ধ শেষ করার যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত এই সংঘাতের মাত্র ২১ বছর পরই পৃথিবী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়।

তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুধু ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। এটি আধুনিক বিশ্বের জন্মের অন্যতম প্রধান মোড়—যার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিধ্বনি আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনুভূত হয়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন