অনুসরণ করুন:
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প জ্বালানি করিডোরে ঝুঁকছে উপসাগরীয় দেশগুলো

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের নতুন বাস্তবতায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইরান সরাসরি প্রণালিটি বন্ধ না করলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ঘটিয়েছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প পাইপলাইন, সমুদ্রবন্দর ও স্থলভিত্তিক জ্বালানি করিডোর গড়ে তুলতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। 

বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছেছে। তাই এ পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার জ্বালানি বাজারেও দ্রুত প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে অনেক শিপিং কোম্পানি অতিরিক্ত ঝুঁকি, উচ্চ বীমা ব্যয় এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের মুখে বিকল্প রুট খুঁজতে শুরু করেছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশলগত অবস্থান তাকে স্বল্পমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিয়েছে। ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির কারণে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যাহত হয়েছে এবং জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে একই কৌশল উপসাগরীয় দেশগুলোকে হরমুজের বিকল্প অবকাঠামো নির্মাণে আরও উৎসাহিত করছে, যা ভবিষ্যতে ইরানের কৌশলগত প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে। 

এ প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব তাদের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহনের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ফুজাইরাহ বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত পাইপলাইন সম্প্রসারণ করছে, যাতে হরমুজে প্রবেশ না করেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি সম্ভব হয়। 

ইরাকও পশ্চিমমুখী রপ্তানি ব্যবস্থা পুনর্গঠনে কাজ করছে। তুরস্কের জেইহান বন্দর, সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল এবং জর্ডানের আকাবা বন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য নতুন ও পুরোনো পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা ও বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশটির রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমবে। 

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে নির্মাণাধীন ও পরিকল্পনায় থাকা একাধিক বিকল্প পাইপলাইন প্রকল্প সময়মতো সম্পন্ন হলে ২০২৮ সালের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ-পূর্ব তেল রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ হরমুজ এড়িয়ে পরিবহন করা সম্ভব হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও পুরোপুরি হরমুজের বিকল্প তৈরি হবে না। নতুন রুটগুলো তুলনামূলক দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বহন করবে। এছাড়া কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর এলএনজি রপ্তানির বড় অংশ এখনও হরমুজের ওপর নির্ভরশীল। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় একটি স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ভবিষ্যতে একক সামুদ্রিক পথের পরিবর্তে একাধিক পাইপলাইন, বন্দর ও বিকল্প করিডোরের সমন্বয়ে একটি বহুমুখী রপ্তানি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বৈচিত্র্যময় হলেও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে। 


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন