বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

উৎপাদন ব্যয় ও বৈশ্বিক চাপের মুখে তিন বছরে বন্ধ ৪০০ পোশাক কারখানা

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দাবি, গত তিন বছরে অন্তত ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। দ্রুত নীতিগত সহায়তা না পেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে শিল্পমালিকদের বিভিন্ন প্রস্তাবনায় উঠে এসেছে এ চিত্র। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ শিল্পটিকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং ডলারের বাজারে অস্থিরতার কারণে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে শ্রমিকদের বেতন প্রায় ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, ভারত ও চীন তাদের রপ্তানিকারকদের জন্য বিভিন্ন করসুবিধা ও প্রণোদনা অব্যাহত রেখেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তৈরি পোশাক শিল্প মূলত সময়নির্ভর ব্যবসা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ডিসকাউন্ট দাবি করে, অর্থ পরিশোধে বিলম্ব করে কিংবা অর্ডার বাতিল করে দেয়। বর্তমানে সাব-কন্ট্রাক্ট কার্যক্রম, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং বন্ড সুবিধায় জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও জাহাজীকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবেও শিপিং ও কার্গো পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এতে রপ্তানিকারকদের ব্যয় আরও বাড়ছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বর্তমানে আগের তুলনায় জ্বালানি সংকট অনেকটাই কমেছে এবং সামনে পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি জানান, বন্ধ কারখানাগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং বাজেটকে সামনে রেখে সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি ইতোমধ্যে সরকারকে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিশ্ববাজারে ব্যয় বাড়লে সরকারকেও অনেক সময় দাম বাড়াতে হয়, তবে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ কমাতে বিকল্প সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তিনি দ্রুত নীতিগত সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

উদ্যোক্তারা আরও অভিযোগ করেন, পোশাক খাতের জন্য ঘোষিত করপোরেট করহার তুলনামূলক কম হলেও বাস্তবে বিভিন্ন ব্যয়কে “অনুমোদনযোগ্য নয়” দেখিয়ে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হচ্ছে। এছাড়া নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ উৎস করও শিল্পের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তারা এই হার কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার পরিমাণও কমেছে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে নতুন রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

তবে সব সংকটের মধ্যেও শিল্পসংশ্লিষ্টরা আশাবাদী। তাদের মতে, সরকার যদি কর ও ভ্যাট কাঠামো সহজ করে, কাস্টমস ও বন্ড প্রক্রিয়া দ্রুততর করে এবং রপ্তানিকারকদের জন্য বাস্তবসম্মত সহায়তা নিশ্চিত করে, তাহলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আবারও বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান ফিরে পেতে সক্ষম হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন